1>স্বামী সার্বপ্রিয়া নন্দ বেলুড় মঠ

  1>স্বামী সার্বপ্রিয়ানন্দ::-বেলুড় মঠ::--

          (সংগ্রহ)

1>স্বামী সার্বপ্রিয়ানন্দ গীতা ও উপনিষদের গুরুত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বারবার বলেন যে, গীতার মূল ভিত্তি উপনিষদ। তাঁর ভাষায়, গীতা আসলে উপনিষদীয় জ্ঞানের সারসংক্ষেপ, যেখানে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যে শিক্ষা দেন, তা বিভিন্ন উপনিষদের তত্ত্বের উপর দাঁড়িয়ে আছে।

 বিশেষ করে, ব্রহ্ম ও আত্মার অভেদ তত্ত্ব,

 কর্মের মধ্যে থেকেও আসক্ত না থাকার ধারণা, এবং আত্মসাক্ষাতের জন্য জ্ঞান, ভক্তি ও কর্ম—এই তিন পথের সমন্বয়—সবই গীতার মূল শিক্ষা, যা উপনিষদ থেকেই এসেছে।

তিনি বলেন, উপনিষদগুলিকে যদি "বেদান্ত" বা "সর্বোচ্চ জ্ঞান" ধরা হয়, তাহলে গীতাকে বলা যায় সেই জ্ঞানের সহজ ভাষ্যে উপস্থাপনা, 

যেখানে একাধারে কর্মের গুরুত্ব, জ্ঞানের গভীরতা, এবং ভক্তির আন্তরিকতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 

তাঁর ব্যাখ্যায় গীতা নিছক ধর্মগ্রন্থ নয়, এটি এক প্রকার দার্শনিক পথনির্দেশিকা, যেখানে জীবনের গভীর প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। তিনি বলেন, উপনিষদ যদি আত্মজ্ঞান বা ব্রহ্মজ্ঞানের শুদ্ধতম রূপ হয়, তাহলে গীতা হল সেই জ্ঞানের প্রয়োগ, যেখানে বলা হয়েছে কিভাবে এক সাধক সংসারে থেকে সেই জ্ঞানকে আত্মস্থ করতে পারেন।

উপনিষদের কথা বলতে গিয়ে তিনি বিশেষভাবে মাণ্ডুক্য উপনিষদ ও বৃহদারণ্যক উপনিষদ নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁর মতে, মাণ্ডুক্য উপনিষদ সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি অদ্বৈত বেদান্তের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও শক্তিশালী উপস্থাপনা। এই উপনিষদে বলা হয়েছে যে সমগ্র বাস্তবতা "ওঁ" এই একমাত্র শব্দের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় এবং জাগ্রত, স্বপ্ন ও গভীর নিদ্রার পার্থক্য বোঝানোর মাধ্যমে চতুর্থ অবস্থান—তুরীয়—ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যা পরম ব্রহ্ম।

বৃহদারণ্যক উপনিষদের ক্ষেত্রে তিনি মূলত আত্মা ও ব্রহ্মের অভেদ তত্ত্বের কথা বলেন। এখানে যাজ্ঞবল্ক্য ও মৈত্রেয়ীর সংলাপের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, আনন্দের প্রকৃত উৎস আত্মার মধ্যেই রয়েছে, বাইরের কোনো বস্তুতে নয়। এই শিক্ষা গীতাতেও প্রতিফলিত হয়েছে, যেখানে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন যে, স্থায়ী সুখ কেবল আত্মস্বরূপকে জানার মাধ্যমেই সম্ভব।

স্বামী সার্বপ্রিয়ানন্দ মহারাজের মতে, গীতার মধ্যে "নিষ্কাম কর্মযোগ" বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, কর্মের মধ্যে থেকে কিভাবে এক সাধক আসক্তি ছাড়াই কাজ করতে পারেন, তা গীতার অন্যতম মূল শিক্ষা। উপনিষদেও এই ধারণা আছে, যেমন ঈশোপনিষদ-এ বলা হয়েছে, "তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ"— অর্থাৎ ত্যাগের মাধ্যমে ভোগ করো। গীতায় এই একই ভাবনা এসেছে, যেখানে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, "কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।"— অর্থাৎ কর্ম কর, কিন্তু তার ফলের প্রতি আসক্ত হয়ো না।

তিনি বারবার বলেন যে, গীতার প্রকৃত শিক্ষা কেবল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সীমাবদ্ধ নয়। এটি জীবনের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি মানুষের জন্য প্রযোজ্য। গীতার অন্তর্নিহিত বাণী হল— কিভাবে কর্ম, জ্ঞান ও ভক্তির সমন্বয়ে একজন মানুষ আত্মসাক্ষাৎ করতে পারেন। উপনিষদ শুধুমাত্র সেই জ্ঞানের তাত্ত্বিক দিকটি বলে, কিন্তু গীতা বলে কিভাবে সেই জ্ঞানকে ব্যবহার করতে হয়।

তাঁর আলোচনা মূলত বেদান্তের অদ্বৈত তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, এবং তিনি স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষার ধারাবাহিকতায় উপনিষদ ও গীতার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যাখ্যা করেন।

==============================

2>স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দ বহুবার দৃগ-দৃশ্য বিবেক নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং এটি যে কেবলমাত্র একটি দার্শনিক বিশ্লেষণ নয়, বরং আত্মসাক্ষাতের এক কার্যকর পদ্ধতি, তা তিনি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, আমাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার মধ্যেই এই বিশ্লেষণ লুকিয়ে আছে, এবং যদি আমরা এটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি, তবে আমাদের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করা সম্ভব হবে।

দৃগ-দৃশ্য বিবেকের মূল ভিত্তি হলো— "দেখনেওয়ালা" (দৃগ) সর্বদা পরিবর্তনহীন, আর "যা দেখা যায়" (দৃশ্য) তা পরিবর্তনশীল। 

সহজ ভাষায় বললে, যেটি পরিবর্তিত হয়, সেটি আমি নই; 

কারণ আমি সেই চেতন সত্তা, যে সব পরিবর্তনের সাক্ষী। স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দ এই চিন্তার মাধ্যমে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন এক গভীর সত্যের সঙ্গে—আমরা দেহ বা মন নই, বরং সেই চিরসাক্ষী চৈতন্য।

প্রথম ধাপে, তিনি আমাদের বাহ্যিক অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করতে বলেন। আমরা চারপাশের বিশ্ব দেখি—গাছপালা, আকাশ, মানুষ, বস্তু। এগুলো আমাদের চোখের সামনে পরিবর্তিত হচ্ছে। যে ব্যক্তি শৈশবে ছিল, সে আজ যুবক, একদিন বৃদ্ধ হবে। অর্থাৎ, এই সমস্ত কিছু পরিবর্তনশীল, তাই এগুলো দৃশ্য। কিন্তু যে ব্যক্তি এই পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করছে, সে কি পরিবর্তিত হচ্ছে? চোখ যদি এই পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করে, তবে চোখ কি পরিবর্তিত হচ্ছে?

এরপর তিনি বলেন, চোখও এক অর্থে দৃশ্য। কেননা, চোখের পরিবর্তনও আমরা অনুভব করতে পারি—যেমন, দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হলে আমরা বুঝতে পারি যে আমাদের দেখা বদলেছে। তাহলে যে দেখে, সে কি শুধুই চোখ? না, কারণ চোখকেও কেউ প্রত্যক্ষ করছে। মন যখন চিন্তা করে, সুখ-দুঃখ অনুভব করে, তখন সেই অনুভূতিগুলোকেও আমরা দেখছি। কিন্তু যদি আমরা মন হই, তাহলে আমরা কিভাবে অনুভব করছি যে মন বদলাচ্ছে? এই পর্যায়ে স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দ ব্যাখ্যা করেন যে, মন, চিন্তা, অনুভূতি—সবই দৃশ্য, কারণ এগুলোর পরিবর্তন আমরা প্রত্যক্ষ করতে পারি। যে চেতন সত্তা এই সবকিছুকে প্রত্যক্ষ করে, সেটি কখনো পরিবর্তিত হয় না। সেটিই আমাদের আসল স্বরূপ। এটি উপলব্ধি করলেই বোঝা যায়, আমাদের প্রকৃত সত্তা শরীর বা মন নয়, বরং এক চিরন্তন সাক্ষী চৈতন্য, যা কখনো পরিবর্তিত হয় না, যা সর্বদা একই থাকে।

স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দ বলেন, যদি আমরা গভীরভাবে চিন্তা করি, তবে এই উপলব্ধি আমাদের দুঃখ, কষ্ট, বিভ্রান্তি থেকে মুক্তি দিতে পারে। কারণ, আমাদের যাবতীয় দুঃখ কেবলমাত্র এই ভুল পরিচয়ের কারণে—আমরা নিজেদের দেহ ও মন মনে করি, তাই এর সুখ-দুঃখ, জন্ম-মৃত্যুর আবর্তে আবদ্ধ হয়ে থাকি। কিন্তু যদি আমরা সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারি যে "আমি" কখনো পরিবর্তিত হই না, আমি জন্ম- মৃত্যুর ঊর্ধ্বে, তবে সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তিনি বারবার বলেন যে, এটি কেবল একটি দর্শনের বিষয় নয়, বরং এটি আমাদের সরাসরি অভিজ্ঞতা করা উচিত। আমরা প্রতিটি মুহূর্তে দেখতে পারি, উপলব্ধি করতে পারি, যে আমিই সেই অবিচলিত, চিরসাক্ষী চৈতন্য। এই জ্ঞানই আমাদের পরম মুক্তির দিকে নিয়ে যায়।

■■■■■■■■■■■■

দৃগ-দৃশ্য" শব্দজোড়টির অর্থ হল "দ্রষ্টা" এবং "দৃশ্য" বা "দেখা" এবং "দেখা যাচ্ছে"। এটি একটি বেদান্তীয় শব্দ যা সাধারণত দর্শনে, বিশেষ করে অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনে ব্যবহৃত হয়। এটি বোঝায় যে যে ব্যক্তি দেখছে (দ্রষ্টা) এবং যা দেখা যাচ্ছে (দৃশ্য), এই দুটি ভিন্ন এবং পৃথক সত্তা। 

আরও বিস্তারিতভাবে বললে: 

দৃগ (দ্রষ্টা):

এটি সেই সত্তাকে বোঝায় যা দেখে বা উপলব্ধি করে, যেমন: মন, বুদ্ধি বা আত্মা।

দৃশ্য (দেখা):

এটি সেই বস্তু বা ঘটনা যা দেখা যায়, যেমন: বাইরের জগৎ, ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভূত হওয়া বিষয়, বা মনের ধারণা।

এই ধারণাটি "দৃগ-দৃশ্য-বিবেক" নামক একটি বেদান্তীয় গ্রন্থে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে, যেখানে দ্রষ্টা ও দৃশ্যের মধ্যেকার পার্থক্য এবং তাদের সম্পর্ক নিয়ে অনুসন্ধান করা হয়েছে। এই গ্রন্থে সবিকল্প ও নির্বিকল্প সমাধির বিবরণ এবং আত্মা ও ব্রহ্মের পরিচয় দেওয়া হয়েছে। 

সংক্ষেপে, "দৃগ-দৃশ্য" শব্দজোড়টি দর্শনে দ্রষ্টা ও দৃশ্যের মধ্যেকার পার্থক্য বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ধারণা। 

====================

 দৃগ-দ্রস্য-বিবেক বা বাক্যসুধা হল একটি অদ্বৈত বেদান্ত গ্রন্থ যা ভারতী তীর্থ বা বিদ্যারণ্য স্বামী (আনুমানিক 1350) এর জন্য দায়ী। ... দৃগ-দৃশ্য-বিবেকে 46টি স্লোক রয়েছে "দ্রষ্টা" ( দৃগ ) এবং "দেখা" ( দৃশ্য ) এর মধ্যে পার্থক্য সম্পর্কে একটি অনুস...

===================

দৃগ-দৃশ্য বিবেক" (Drig-Drishya Viveka) হলো ভারতীয় দর্শনশাস্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ, যা মূলত "দ্রষ্টা" (দ্রষ্টা) ও "দৃষ্ট" (দৃষ্ট) বা "viewer" এবং "seen" এর মধ্যেকার পার্থক্য ব্যাখ্যা করে। এটি ভারতীয় বেদান্ত দর্শনের (Advaita Vedanta) একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। 

এই গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, "দৃগ" (দ্রষ্টা) হলো সেই সচেতনতা বা চেতনা যা সবকিছুকে উপলব্ধি করে, আর "দৃশ্য" (দৃষ্ট) হলো সেই সমস্ত বস্তু বা ঘটনা যা এই চেতনার দ্বারা উপলব্ধি করা হয়। 

আরও বিস্তারিতভাবে, "দৃগ-দৃশ্য বিবেক" গ্রন্থে: 

দ্রষ্টা ও দৃশ্যের মধ্যে পার্থক্য আলোচনা করা হয়েছে।

সচেতনতা এবং তার কাজ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

সৃষ্টিকর্তা ও বিশ্বের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

সমাধি ও আত্মিকতার ধারণা আলোচনা করা হয়েছে।

আত্মা ও ব্রহ্মের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

এই গ্রন্থটি বেদান্ত দর্শনের মূল ধারণাগুলোকে সহজভাবে উপস্থাপন করতে সাহায্য করে, যা ভারতীয় দর্শনে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। 

দৃগ-দৃশ্য-বিবেক -

Translated — দৃগ-দ্রস্য-বিবেক বা বাক্যসুধা হল একটি অদ্বৈত বেদান্ত গ্রন্থ যা ভারতী তীর্থ বা বিদ্যারণ্য স্বামী (আনুমানিক 1350) এর জন্য দায়ী। ... দৃগ-দৃশ্য-বিবেকে 46টি স্লোক রয়েছে "দ্রষ্টা" ( দৃগ ) এবং "দেখা" ( দৃশ্য ) এর মধ্যে পার্থক্য সম্পর্কে একটি অনুস...

দৃগ্‌-দৃশ্য-বিবেক -

বিষয়বস্তু দৃগ্‌-দৃশ্য-বিবেক গ্রন্থে ৪৬টি শ্লোক আছে। বইটিতে দ্রষ্টা ('দৃগ্‌') ও দৃষ্টের ('দৃশ্য') মধ্যে দ্বৈতবোধ নিয়ে অনুসন্ধানমূলক প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সেই সঙ্গে সবিকল্প ও নির্বিকল্প সমাধির বিবরণ এবং আত্মা ও ব্রহ্মের পরিচয় দেওয়া হয়েছে।

দৃগ দৃশ্য বিবেক (Drga drishy bibek) - ব্যাখ্যা - Google Books

দৃগ-দৃশ্য-বিবেকস্বামী ত্রৈলোক্যানন্দ....দৃগ-দৃশ্য-বিবেক একটি প্রায় হারিয়ে যাওয়া, সনাতন প্রকরণ শাস্ত্র যা অতি সংক্ষেপে ঘটনার দ্রষ্টা এবং দৃশ্যের মধ্যেকার বিজ্ঞান‌ বোঝায়, কর্তা এবং কর্মকে পৃথকভাবে দেখার চোখ প্রদান করে।


Google Books

দৃগ-দৃশ্য-বিবেক: দ্রষ্টা ও দর্শনের জ্ঞান

Translated — সমস্ত বস্তু ইন্দ্রিয়ের দ্বারা অনুভূত হয়। ইন্দ্রিয়গুলি, ঘুরে, মনের দ্বারা অনুভূত হয়। মন, ঘুরে, সচেতনতায় উদ্ভাসিত একটি আন্দোলন। সচেতনতা অন্য কোন কাঠামো দ্বারা অনুভূত হয় না. এটা তার নিজস্ব উপলব্ধি।

========================








Comments

Popular posts from this blog

স্বামীজীর মা::--

||বেলুড়মঠের প্রতিষ্ঠার কথা::---

গুরুভক্তি কেমন হওয়া উচিত ।।