>|| আজ, শ্রী শ্রী সারদা মায়ের জন্মতিথি 03/01/2024
>আজ, শ্রী শ্রী সারদা মায়ের জন্মতিথি 03/01/2024
আজ, শ্রী শ্রী সারদা মায়ের জন্মতিথি উপলক্ষে মা ও তাঁর সন্তান দের কিছু অদ্ভুত তথ্য:-
হামেদি শেখ, মফেতি শেখ, রমজান পাঠান গরুর গাড়ির ব্যবসা করত ।তারা গোরুর গাড়ি করে যাত্রীদের
বিষ্ণুপুর পৌঁছে দিত।
আমি দেখেছি, অনেকবারই তারা শ্রীমা ও তাঁর ভাইঝিদের কোয়ালপাড়া থেকে জয়রামবাটী পৌঁছে দিয়েছে অথবা জয়রামবাটী থেকে কোয়ালপাড়ায় নিয়ে গেছে। কখনো জয়রামবাটী থেকে বিষ্ণুপুরে পৌঁছে দিয়েছে কলকাতার পথে। গরুর গাড়ির গাড়োয়ান হিসাবে যোগাযোগ ছাড়াও তাদের সঙ্গে মায়ের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। মায়ের নতুন বাড়ি যখন তৈরি হয়, তখন মাটির দেওয়াল দেওয়ার মজুরদের বেশির ভাগ ছিল শিরোমণিপুর আর পরমানন্দপুরের লোক। শিহড়ের কাছে মায়ের ভাইদের কিছু জমি চাষ করত মফেতি শেখ। হামেদি শেখের স্ত্রী নফিজান বিবি ও মফেতি শেখের স্ত্রী মজিরন বিবির সঙ্গেও মায়ের বিশেষ স্নেহের সম্পর্ক ছিল। তারা মাঝে মাঝেই মায়ের বাড়ি যেত। মা তাদের বলতেন 'বিবি বউ'। তাদের পেটভরে খাওয়াতেন, সুখ-দুঃখের কথা শুনতেন।
মায়ের যখন নতুন বাড়ি হয় তখন শরৎ মহারাজ জয়রামবাটী এসেছিলেন।' এসময় তিনি শিরোমণিপুর ও পরমানন্দপুরেও
এসেছিলেন। আমি তাঁকে দেখেছি। বিশেষ করে মায়ের নতুন বাড়িই শিরোমণিপুর ও পরমানন্দপুরের লোকদের মায়ের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসার সুযোগ করে দিয়েছিল। তখন জাতপাত নিয়ে খুব সঙ্কীর্ণতা ছিল ঐ অঞ্চলের হিন্দুদের মধ্যে। হিন্দুরা মুসলমানদের ঘরে ঢুকতে দিত না। মায়ের নতুন বাড়ি হওয়ার সময় মুসলমান মজুরদের কাজে লাগানোর জন্য জয়রামবাটীর গোঁড়া বামুনরা অনেক কথা বলেছিল। ওরা মাকে 'ম্লেচ্ছ' বলতেও দ্বিধা করেনি। মায়ের আত্মীয়রাও মাকে বাড়ি তৈরির কাজে আমাদের লাগাতে নিষেধ করেছিল। মা লোকের সামনে মাথায় কাপড় ঢাকা না দিয়ে বেরতেন না। খুবই আস্তে আস্তে কথা বলতেন, কিন্তু যা অন্যায় তার বিরুদ্ধে নির্ভয়ে প্রতিবাদ করতেন। এব্যাপারে কোন আপসের পক্ষপাতী তিনি ছিলেন না। গ্রামের লোকদের চাপে দু-একদিন মায়ের ঘরের কাজ বন্ধ ছিল। পরে শুনেছি-মা বলেছিলেন, কেবল আমাদের দিয়েই কাজ করাবেন। শেষপর্যন্ত মায়ের জেদ ও সঙ্কল্পের কাছে গ্রামের গোঁড়াদের নতি স্বীকার করতে হয়েছিল। তারপর থেকে মায়ের বাড়িতে আমাদের খুব যাতায়াত হতে লাগল।
তখন জয়রামবাটীতে কিছু পাওয়া যেত না। বড় হাট বলতে বদনগঞ্জ আর কোতুলপুর। শিরোমণিপুরে একটি ছোট হাট বসত। গ্রামের সব ঘরেই কিছু আনাজের চাষ হতো। মফেতি-চাচা তার সবজিখেত থেকে প্রায়ই লাউ, কুমড়ো, সজনে ডাঁটা, কচু প্রভৃতি আনাজপাতি নিয়ে মায়ের বাড়ি যেত। তার মুখে একটা ঘটনার কথা আমি শুনেছিলাম। সে বলতঃ "মা মানুষ নন, বড় পীর-দরবেশ হবেন। আমি একবার লাউ নিয়ে মায়ের বাড়ি গেছি। গিয়ে দেখি, নতুন বাড়িতে মা পুজোয় বসেছেন। আমি মায়ের বাড়িতে হামেশাই যাতায়াত করতাম বলে আমার কোন আড়ষ্টতা ছিল না। আমি গিয়ে ডাক দিলাম, 'মা! লাউ এনেছি।' আমার ডাক শুনে একজন মেয়েলোক এসে বলল, 'একটু বস, মা পুজোয় বসেছেন।' আমি দূর থেকে দেখতে পেলাম যে, মা পুজোর আসনে বসে আছেন। আমি উঠোনের
এককোণে লাউ ও লাউশাক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ মায়ের পুজোর আসনের দিকে তাকিয়ে দেখি, মা সে-আসনে নেই, আর মায়ের বসে থাকা দেহটা যেন আসন থেকে দুহাত ওপরে। মা ঠিক সেইভাবেই বসে আছেন, আসনটা নিচে পড়ে রয়েছে। মা শূন্যে বসে জপ করছেন! আমি মনে মনে ভাবছি, ভুল দেখছি না তো! চোখ মুছে আবার তাকিয়ে দেখি সেই দৃশ্য! বোকার মতো তাড়াতাড়ি মহারাজদের যেই ডাকতে যাচ্ছি, দেখি আর কিছু নেই। তারপর মা আসন থেকে উঠে আসতে তাঁকে প্রণাম করলাম। কিন্তু প্রণাম করতে ভয় হচ্ছিল খুব। মা আমাকে মুড়ি-গুড়, মাথার তেল দিতে বললেন একজন মহিলাকে। সেসব নিয়ে চলে এলাম, কিন্তু মাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস হলো না।"
মুসলমান পুরুষরাও যেমন মায়ের বাড়ি যেত, মুসলমান মেয়েরাও যেত। শিরোমণিপুরের কয়েকজন বিবি ফল ও সবজি বিক্রি করতে জয়রামবাটী যেত। প্রৌঢ়া সাবিনা বিবি ছিল তাদের মধ্যে একজন। সে প্রায়ই মায়ের বাড়িতে যেত। আম-কাঁঠালের সময় সে কোতুলপুর থেকে আম-কাঁঠাল এনে জয়রামবাটীতে বিক্রি করতে যেত। মায়ের মা-ও তাকে খুব ভালবাসতেন। মা তাকে বলতেন 'খুড়ি'।
আগে শিরোমণিপুর-শিহড় অঞ্চলে খুব খেজুরগাছ ছিল। তখনকার লোকেরা খেজুরগাছের মাথা চেঁচে খেজুররসের ভাঁড় ঝুলিয়ে দিত। প্রায় শ-খানেক খেজুরগাছ থেকে রোজ খেজুররস নামত। সেই রস থেকে খেজুরগুড় তৈরি হতো। শাজাহান খাঁ, মজির খাঁ, সাদেক আলি, রফি মিঞা-এমন অনেকেরই খেজুররসের ব্যবসা ছিল। কোতুলপুর, বদনগঞ্জ, কামারপুকুর চটি, গোঘাট ইত্যাদি জায়গায় তারা খেজুরগুড় বিক্রি করত। তাদের অনেকের সেটিই ছিল জীবিকা। খেজুরগুড় তৈরির কাজ খুব পরিশ্রমসাধ্য। আমাদেরও খেজুররসের বাবড়া ছিল। আমি অনেকবার খেজুররস ও খেজুরগুড় নিয়ে মায়ের বাজিব গেছি। মা খেজুরের জিরেন রস ও খেজুর গুড় যেতে পার ভালবাসতেন। আমি খেজুরগুড় নিয়ে গেলে মা পয়সা দিতেন। পয়সা
নিতে না চাইলে মা বলতেন: “বাবা, পয়সা নিতে হয়। ওটা যে পরিশ্রমের জিনিস।” পয়সা দিয়ে তার ওপর মা প্রচুর প্রসাদ, মুড়ি, মুড়কি দিতেন।
শিরোমণিপুরের দুদু ফকির ও সেলিম ফকিরও মায়ের বাড়িতে যেত। নবান্নের সময় তারা চামর দুলিয়ে ভিক্ষে করত। শ্রীমা তাদের খুব ভালবাসতেন ও ভক্তি করতেন। শিরোমণিপুরের পীরের দরগায় তিনি ঘোড়া ও সিন্নি মানত করতেন। হামেদি-চাচা ও মফেতি-চাচা বলত: "মায়ের কী ভক্তি! আমাদের পাল-পরবে মা সিন্নি মানত করে, বাতাসা দেয়।” মফেতি-চাচা মাকে জিজ্ঞেস করেছিল: “মা, মুসলমানদের পরবে আপনি সিন্নি-বাতাসা পাঠান কেন? আপনারা তো হিন্দু!"
মা বলতেন: “বাবা! ঠাকুর কী আলাদা হয়? সবই এক। তোমরা তো জান বাবা, তোমাদের ঠাকুর ইসলামধর্মও সাধনা করেছিলেন। সেসময় নামাজ পড়তেন মুসলমানের মতোই। সবই এক বাবা! নামেই শুধু ভিন্ন।" মফেতি-চাচাকে এবং আমাদের সবাইকে মা যেমন বিশ্বাস করতেন তেমনই ভালবাসতেন।
অনেক আগে একবার মায়ের মন্দিরে বাজ পড়ে। কিশোরী মহারাজ (স্বামী পরমেশ্বরানন্দ) মফেতি-চাচাকে বলেছিলেন: “হ্যাঁরে মফেতি, মায়ের মন্দিরে যে বাজ পড়ল! একবার আজান দিস তো!” মফেতি-চাচা মহারাজের কথামত মন্দিরের কাছে আজান দিয়েছিল। কিশোরী মহারাজ মায়ের কাছেই মানুষ। সত্যি! মায়ের শিক্ষায় ওঁরাও ছিলেন সব-ধর্মেরই লোক। আমরা ঠাকুর-মাকে পীর-পয়গম্বররূপেই দেখি। হামেদি-চাচা ও মফেতি-চাচাকে দেখেছি, ওরা মনে-প্রাণে ঠাকুর আর মাকে। তা-ই ভাবত। ওঁদের মতো মানুষ কি আর আসবে? ওঁরা তো আল্লার দূত-বেহেস্তের ফেরেশতা!"
[রসন আলী খাঁ - শ্রীশ্রীমায়ের পদপ্রান্তে, সম্পাদক - স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ]
|| সংগ্রহীত ||
Comments
Post a Comment