★★"ক্রশবিদ্ধ বিবেকানন্দ।"||-পর্ব (1-10
>||★★"ক্রশবিদ্ধ বিবেকানন্দ।"||-পর্ব (1-10)
স্বামী পুর্নাত্মানন্দ
লেখাটি দশটি পর্বে।
( সম্পুর্ন লেখাটি ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংগ্রহীত ) ৷
প্রথব পর্ব।★★★★★★★★
প্রিয় ইংরেজ শিষ্য ই . টি . স্টার্ডির কাছে যে নিদারুন মানসিক আঘাত স্বামীজি পেয়েছিলেন আর ক্ষমার মহান মূর্তি স্বামীজি তাঁর শিষ্যকে অবিচল আশীর্বাদ করেছেন তারই কাহিনী বর্ণনা করছেন স্বামী পূর্নাত্মানন্দজী মহারাজ ৷
এখানে সেই কাহিনী বর্ণনার প্রচেষ্টা
করা হয়েছে ৷
ভারতে তো বটেই বলা যেতে পারে সমগ্র
পৃথিবীতেই বর্তমান যুগে সর্বাধিক আলোচিত ও আলোড়নকারী ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম স্বামী বিবেকানন্দ ৷ জীবনকালে যে সংবর্ধনা , শ্রদ্ধা-বন্দনা এবং উচ্ছসিত সমাদর তিনি দেশে-বিদেশে লাভ করেছিলেন তা ছিল বাস্তবিক অসাধারণ এবং অভুতপূর্ব ৷ শুধুমাত্র তাঁকে দেখার জন্য শিকাগোর ধর্মসভায় কয়েক হাজার শ্রোতা উন্মাদের মতো আচরন করেছিল ৷ শিকাগো ধর্মসভায় বিভিন্ন অধিবেশনে শ্রোতৃবৃন্দকে ধরে রাখার জন্য উদ্যোক্তাদের পক্ষে এইটুকু ঘোষনাই যথেষ্ট ছিল যে ,
" শেষে স্বামী বিবেকানন্দ পাঁচ মিনিট ভাষণ দেবেন ৷ "
শুধু তাঁর সেই " পাঁচ মিনিট " -এর ভাষন শোনার জন্য অগনিত দর্শক এক ডজন ক্লান্তিকর দীর্ঘ ভাষন সহ্য করে অপেক্ষা করতেন ৷ যখন পাশ্চাত্য বিজয়ের গৌরবটিকা ললাটে নিয়ে তিনি ভারতবর্ষে ফিরেছেন , তখনও সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে ৷ ঘোড়া খুলে দিয়ে তাঁর গাড়ি সানন্দে টেনেছেন রাজা-মহারাজরা , অভিজাত ব্যক্তিবর্গ , কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক , শিক্ষক এবং ছাত্ররা ... এবং এতে সবাই নিজেদের ধন্য মনে করেছেন ৷ তখনও সাধারন মানুষরা দলে দলে তাঁকে দেখার জন্য সভায় , রাস্তায় , রেল-ষ্টেশনে ভিড় করেছেন ৷ বিশাল সভাগৃহে কোথাও তিল ধারনের জায়গা নেই ... সভাগৃহের বাইরে হাজার হাজার মানুষ সমবেত ৷ তাঁরা চীৎকার করছেন যে , তাঁরা স্বামীজিকে দেখতে চান এবং তাঁর কথা শুনতে চান ৷ সভাগৃহে সভা স্থগিত করে স্বামীজিকে বাধ্য হয়ে বাইরে অগনিত জনসমুদ্রের মাঝখানে এসে দাঁড়াতে হয়েছে ৷ এমন স্বতঃস্ফুর্ত দৃশ্য সত্যিই ইতিহাসে বিরল ৷ সাধারন মানুষ দলে দলে সর্বত্র তাঁকে দেখার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করেছেন ৷ মাদ্রাজ থেকে কোলকাতা , সর্বএই এক ছবি ৷
বাস্তবিক , যে সম্মান , শ্রদ্ধা স্বামীজি তাঁর জীবনকালে লাভ করেছিলেন তা বিস্ময়কর ৷
পাশাপাশি একটি ভিন্ন ছবিও ছিল ৷ কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ এবং কিছু ঈর্ষাপরায়ন অসুখী মানুষ পরিকল্পিতভাবে তাঁকে মানুষের কাছে হেয় করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন ... তাঁদের সংখ্যা যত অল্পই হোক না কেন , ইতিহাসের স্বার্থে এই বিষয়টি আমাদের মনে রাখা দরকার ৷ সাম্প্রতিককালেও দু'চারজন বিষয়টি নিয়ে নতুন করে 'গবেষণা ' করে বিবেকানন্দের মহিমাকে খর্ব করার এবং নস্যাৎ করার আপ্রান চেষ্টা করছেন এবং করে চলেছেন । বলা বাহুল্য , বিবেকানন্দের সমকালেও এই পরিকল্পিত সমালোচনা যেমন তাঁর জ্যোতির্ময় মুর্তিকে ম্লান করতে পারেনি , তেমনই বিবেকানন্দের সার্ধশতবর্ষের লগ্নে দাঁড়িয়ে আমরা লক্ষ করেছি , সাম্প্রতিককালেও ওই ধরনের পরিকল্পিত ' গবেষণা ' বিবেকানন্দ সম্পর্কে অজস্র ইতিবাচক আলোচনার প্লাবনে খড়কুটোর মতো ভেসে যাচ্ছে ৷ যে কোনও মহৎ মানুষের জীবনে নিন্দা -সমালোচনা নতুন কিছু নয় বরং তা স্বাভাবিক ৷ ভগবান রামচন্দ্র , শ্রীকৃষ্ণ , বুদ্ধ , খ্রিস্ট , মহম্মদ , নানক , চৈতন্য থেকে শুরু করে আধুনিক কালের রামমোহন , বিদ্যাসাগর , বঙ্কিমচন্দ্র , শ্রীরামকৃষ্ণ , রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ কেউই নিন্দা-সমালোচনার বাইরে যেতে পারেন নি ... এটি সত্য , এটি ইতিহাস ৷ পাশাপাশি এটিও সত্য এবং ইতিহাস যে নিন্দা এবং সমালোচনার ঘূর্ণাবর্ত যতই প্রবল হয়েছে তাঁদের কীর্তির গৌরবে তাঁরা ততই উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়েছেন ৷ নিন্দা -সমালোচনার মধ্যে অনেক সময় একটি মানসিকতা থাকে তা হল এই .... মহান কাউকে সমালোচনা করলে সমালোচক অনেকের দৃষ্টিপথে আসবেন ৷ বিবেকানন্দের সমালোচকদের মধ্যে কারও কারও সম্পর্কে এরকম অবশ্যই বলা যায় যে তাঁরা বিবেকানন্দের সমালোচনার সূত্রেই ' বিবেকানন্দ -গবেষনায় ' পরিচিতি লাভ করেছেন ... সে পরিচিতি যতটুকুই হোক ৷
সাধারনভাবে এবং সার্বিকভাবে অবশ্য বিবেকানন্দ সমালোচকদের নতুন গবেষণা মানুষকে আগে এবং এখনও স্পর্শ করেনি ... এটিও ইতিহাস ৷ আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন এই গবেষণার অনেক তথ্যই রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন প্রকাশিত গ্রন্থাদিতে ইতিপূর্বে প্রকাশিত হয়েছে ৷ তথ্যকে সবসময় রামকৃষ্ণ মঠ এবং মিশন নির্দ্বিধায় প্রকাশ করেছেন আর " সত্যান্বেষী গবেষকগন " সেই তথ্য নিয়েই বিবেকানন্দকে আক্রমন করেছেন ৷ মঠ ও মিশন স্বামীজির ভাব নিয়ে কাজ করে চলেছে ... যে ভাব হল , সত্যকে নির্দ্বিধায় প্রকাশ করো ৷ যে যার মতো করে তার ব্যাখ্যা করুক ৷
স্বামীজির চরিত্রের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে , স্বামীজি সম্মান ও সমাদরকে সর্বদা নির্লিপ্তভাবে গ্রহন করেছেন । পাশ্চাত্য দেশের প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন , তিনি তাঁর সম্পর্কে মানুষের অভূতপূর্ব ও উচ্ছসিত সমাদরকে শিশুর সারল্যে গ্রহন করতেন ৷ আবার যখন তাঁর বিরুদ্ধে নিন্দা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে তখনও তিনি শান্ত থেকেছেন ,পরম নির্লিপ্তিতে তাকেও গ্রহন করেছেন ৷ তবে স্বামীজিও তো মানুষ ছিলেন , আমাদের মনে হয় যখন এই নিন্দা -সমালোচনা আকস্মিকভাবে তাঁর একদা প্রিয়জনের কাছ থেকে এসেছে, তখন কি তিনি ব্যথিত হন নি ?
আমাদের মনে হয় ব্যথিত অবশ্যই হয়েছেন ৷ তবে বেদনায় দীর্ন হলেও তিনি কখনও তাঁর ওই একদা প্রিয়জনদের ' বেইমান ' বা 'বিশ্বাসঘাতক ' বলে মনে করেন নি ৷ ভেবেছেন , তাঁরা নিশ্চয়ই তাঁকে ভুল বুঝেছেন , যে ভূল বোঝার জন্য তাঁর নিজের সারল্য , তাঁর উদার্যই ছিল দায়ী বলে তিনি মনে করতেন বিবেকানন্দের কাছাকাছি এসেছেন অন্তরঙ্গ হয়েছেন আবার প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে সমালোচনায় তাঁকে বিদ্ধ করেছেন এমন মানুষের মধ্যে ছিলেন আমেরিকান শিষ্যা মারি লুই ,রাশিয়ান শীষ্যা লিঁও ল্যান্ডসবর্গ এবং ব্রিটিশ শিষ্য ই . টি . স্টার্ডি প্রমূখ | আমরা এবার এদের নিয়ে আলোচনা করব | আলোচনায় নিয়ে আসব স্বামী বিবেকানন্দ ও তাঁর ব্রিটিশ শিষ্য ই . টি . স্টার্ডিকে ..... দেখব এক অন্তরঙ্গ এবং প্রিয় শিষ্য স্টার্ডি স্বামীজীকে কিভাবে ' ক্রুশবিদ্ধ ' করে রক্তাক্ত করেছেন আর ক্ষমার মহান মুর্তি স্বামীজী শিষ্যকে অবিচলভাবে আশীর্বাদ করছেন এবং অসাধারণ ঔদার্যে শিষ্যের বিশ্বাসঘাতকতাকে ভুলে গিয়ে তার কল্যাণের জন্য তাঁর প্রার্থনা উজাড় করে দিচ্ছেন ৷
=====================
(2)দ্বিতীয় পর্ব।★★★★★★
"ক্রশবিদ্ধ বিবেকানন্দ।"
স্বামী পূর্নাত্মানন্দ ।
স্বামীজির জীবনের সঙ্গে যাঁরা পরিচিত তাঁদের কাছে তাঁর ইংরেজ শিষ্য ই . টি . স্টার্ডির নাম অচেনা নয় ৷ ইংল্যান্ডে স্বামীজির বেদান্তপ্রচারের ক্ষেত্রে এই স্টার্ডি একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহন করেছিলেন ৷ আমেরিকায় স্বামীজির সাফল্যের সংবাদে উৎসাহিত হয়ে তিনি স্বামীজির সঙ্গে পত্রালাপ শুরু করেন ৩০মার্চ ১৮৯৫-তে এবং স্বামীজিকে ইংল্যান্ডে এসে বেদান্তপ্রচার করার জন্য আন্তরিক আমন্ত্রন জানান ৷ যদিও স্টার্ডির আগেই কেমব্রিজের মিস হেনরিয়েটা মুলার স্বামীজিকে ইংল্যান্ডে আসার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন , কিন্তু স্টার্ডির আমন্ত্রনকে " দৈব আহ্বান " বলেই স্বামীজি গ্রহণ করেছিলেন ৷ ১৮৯৭-এর জানুযারীতে ভারতে প্রত্যাবর্তনের আগে আমেরিকা থেকে স্বামীজি দুবার ইংল্যান্ডে এসেছিলেন ৷ প্রথমবার আসেন ১০ সেপ্টম্বর ১৮৯৫ খ্রীষ্টাব্দে এবং থাকেন প্রায় আড়াই মাস অর্থাৎ ২৬-শে নভেম্বর ১৯৮৯ সালে ৷ দ্বিতীয়বার আসেন ২০ এপ্রিল ১৮৯৬ সালে এবং থাকেন ১৬-ই ডিসেম্বর ১৮৯৬ পর্যন্ত অর্থাৎ স্বদেশের পথে রওনা হওয়া পর্যন্ত ছয় মাস ৷ মাঝের দুই মাস অর্থাৎ ১৯ জুলাই থেকে ১৬-ই সেপ্টম্বর পর্যন্ত সুইজারল্যান্ড , জার্মানি এবং হল্যান্ড ভ্রমন করেন ৷ দু' বারেই স্বামীজির ইংল্যান্ডে আমার পিছনে ছিল স্টার্ডির প্রবল আগ্রহ এবং সাদর আমন্ত্রন ৷ এই দু' বারের ইংল্যান্ড ভ্রমনে স্বামীজি বেশ কিছুদিন লন্ডন থেকে ৩৬ মাইল পশ্চিমে রেডিং-এ স্টার্ডির বাড়িতেই অতিথি হিসেবে থেকেছেন। পরে কাজের সুবিধার জন্য স্থান পরিবর্তন করেছিলেন ৷ ইংল্যান্ডে স্বামীজি শুধু বাসস্থানের ব্যাপারেই নয় , বক্তৃতার ব্যবস্থাপনার এবং স্বামীজির অনুপস্থিতিতে কার্য পরিচালনার দায়িত্ব মুলতঃ স্টার্ডিকেই সানন্দে ও সোৎসাহে বহন করতে দেখা গিয়েছে ৷ কিন্তু দুঃখের বিষয় মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ১৮৯৯ খ্রীষ্টাব্দের মাঝামাঝি এই স্টার্ডি স্বামীজি তথা বেদান্ত-আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেন ৷
এবার আমরা আলোচনা করব কিভাবে এই ই . টি . স্টার্ডি স্বামীজীর সান্নিধ্যে আসেন ।
ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিকতার প্রতি ষ্টার্ডির বরাবর একটি বিশেষ আকর্ষন ছিল ৷ স্বামীজির সঙ্গে পরিচয়ের কিছুকাল আগে তিনি ভারতবর্ষে এসেছিলেন এবং হিমালয়ের আলমোড়া অঞ্চলে যোগাভ্যাস , শাস্ত্রচর্চা এবং ভারতীয় মতে কৃচ্ছসাধন করেছিলেন ৷ ওই সময়ে মহাপুরুষ মহারাজ বা স্বামী শিবানন্দের সঙ্গে স্টার্ডির পরিচয় হয় ... সময়টি ছিল ১৮৯৩ খ্রীষ্টাব্দের গ্রীস্মকাল , মহাপুরুষ মহারাজ তখন আলমোড়া অঞ্চলে তপস্যা করছিলেন ৷ তাঁর ওই সময়ে লেখা কিছু চিঠিতে স্টার্ডির উল্লেখ পাওয়া যায় এবং জানা যায় যে স্টার্ডি তখন থিওসফি মতে বিশ্বাসী ৷ ৮- ই মে ১৮৯৩ তারিখে প্রমদাদাস মিত্রকে আলমোডা থেকে লেখা চিঠিতে স্বামী শিবানদ লিখছেন , " এখানে একজন ইরেজ , লন্ডন থিওসফিক্যাল সোসাইটির সভ্য আসিয়াছেন ৷ ইহার আচার-ব্যবহার ও যোগমার্গে নিষ্ঠা দেখিয়া চমৎকৃত হইয়াছি ... যথার্থ একটি হিন্দু সন্ন্যাসীর ন্যায় , ইনি আলাপ করিবার যোগ্য ৷ যে আশ্রমে আমি বাস করি তাহার অতি নিকটে ইনিও বাস করেন এবং সর্বদাই সৎপ্রসঙ্গ হয় ৷ '
মহাপুরুষ মহারাজের পরবর্তী চিঠিটি হল ১৩-ই মে ১৮৯৩ খ্রীষ্টাব্দে সেখানে তিনি প্রমদাদাস মিত্রকে লিখছেন , " থিওসফিষ্ট সাহেবটির নাম ঈ . টি . স্টার্ডি , আপনি বোধহয় ইহাকে চিনবেন না ৷ অতি শান্ত , আচার-ব্যবহার ঠিক ব্রাহ্মণের ন্যায় ৷ ব্রাহ্মণের হাতের অন্ন গ্রহণ করেন।
নিদ্রা চারি ঘণ্টার অধিক নয় ৷ সত্ত্বগুণ অনেক পরিমাণে বৃদ্ধি হইয়াছে ৷ মনে জ্ঞান লাভের জন্য খুব অনুরাগ | বয়স ৩৩ বৎসর এবং বালব্রহ্মচারী। স্বামীজীকে লেখা তাঁর প্রথম পত্রে স্টার্ডি নিজের পরিচয় প্রদান প্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন যে , তিনি স্বামীজীর গুরুভাই স্বামী শিবানন্দের পূর্বপরিচিত। প্রিয় গুরুভাইয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচিতির সংবাদ স্বামীজীকে স্টার্ডির প্রতি প্রথম পত্রালাপেই সবিশেষ অনুরক্ত করেছিল সন্দেহ নেই। শীঘ্রই পত্র- মাধ্যমে উভয়ের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং অল্পদিনের মধ্যে স্টার্ডির পক্ষ থেকে স্বামীজির কাছে ইংল্যান্ডে আসার উষ্ণ আমন্ত্রণ আসে। স্টার্ডি স্বামীজীকে জানান যে , তাঁকে ইংল্যান্ডে এসে অনেকদিন থাকতে হবে যাতে সেখানে একটি স্থায়ী এবং শক্তিশালী বেদান্ত সমিতি গড়ে তোলা সম্ভব হয়। স্টার্ডির আমন্ত্রণকে স্বামীজী ' দৈব আহ্বান ' বলে গ্রহণ করেছেন তা আমরা আগেই বলেছি ৷
ইংল্যান্ডে স্বামীজীর বেদান্ত - প্রচারের সাফল্য আমেরিকার চেয়েও সন্তোষজনক হয়েছে বলে স্বামীজী নিজেই মত প্রকাশ করেছিলেন। তবে স্টার্ডির পরবর্তী ভূমিকা পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ইংল্যান্ডে স্বামীজীর বেদান্ত প্রচারের সাফল্য সম্পর্কে তাঁর মন্তব্যের উল্লেখ এখানে প্রাসঙ্গিক হবে। স্বামীজীর প্রথমবার লন্ডন ত্যাগের পর ' ব্রহ্মবাদিন ' পত্রিকার সম্পাদকে একটি চিঠিতে স্টার্ডি লিখছেন ," স্বামী বিবেকানন্দের ক্লাস ইংরেজ সমাজের নানা স্তরের যথেষ্ট সংখ্যক মানুষকে আকর্ষণ করেছে । তাঁদের অধিকাংশই আচার্য হিসাবে স্বামীজীর ক্ষমতা ও যোগ্যতা সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ধারণা নিয়ে গিয়েছে ৷ ' দ্বিতীয়বার যখন স্বামীজি ইংল্যান্ডে আছেন তখন একটি চিঠিতে ইংল্যান্ডে স্বামীজীর প্রভাব সম্পর্কে স্টার্ডি ( ২২ অক্টোবর ১৮৯৬ ) লিখছেন , এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে , স্বামী বিবেকানন্দের মত বেদান্ত প্রবক্তার প্রভাব যদি বজায় রাখা এবং বিস্তারিত করা যায় , তাহলে তা পাশ্চাত্য জগতের চিন্তা ধারাকে বহুলাংশে নিয়ন্ত্রিত করবে , সম্পদ এবং বিলাসের প্রতি দারুন লালসায় আত্মবিস্মৃত তাদের মনের গতি পরিবর্তনে সহায়তা করবে ৷ স্বামীজীর ভারত প্রত্যাবর্তনের প্রাক্কালে ১৩ ডিসেম্বর ১৮৯৬ লন্ডনে যে বিরাট বিদায় - সংবর্ধনা জানানো হয়েছিল ( যে সভায় স্টার্ডিই সভাপতিত্ব করেছিলেন ) তার বর্ণনা দিয়ে স্টার্ডি ঘটনার তিন দিন পর ১৬-ই ডিসেম্বর তাঁর এক আমেরিকান বন্ধুকে লেখেন ,
' তাঁর স্বামীজীর )কাজ নিয়ে সরাসরি এগিয়ে চলেছি I তাঁর গুরুভাই ( অর্থাৎ স্বামী অভেদানন্দ যিনি ইতিমধ্যে স্বামীজীর কাজের ভার নেওয়ার জন্য স্বামীজীর আহ্বানে ইংল্যান্ডে এসেছেন ) অতি চমৎকার , আকর্ষক এবং তপস্যাপ্রবন বৈরাগ্যবান যুবক , তিনি এ ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করবেন ৷ তোমার ধারনা ঠিকই । আমার জীবনের মহওম বন্ধু ও পবিত্রতম শিক্ষককে বিদায় দিয়ে আজ আমার হৃদয় ভারাক্রান্ত। আমি নিশ্চয়ই গত জীবনে অসাধারণ কোন শুভকর্ম করেছি যার জন্য এমন পূন্য - সৌভাগ্য লাভ করেছি ৷ আমি সারা জীবন ধরে যা চেয়েছি , সেই সমস্তরই পরিপূর্তি দেখেছি স্বামীজীর মধ্যে। আর আমি যখন লন্ডন থেকে সত্যিই বিদায় দিচ্ছেন ( ১৬ ডিসেম্বর ১৮৯৬ ) তখন স্টার্ডি স্বীকার করছেন, " আমি স্বামীজীর বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ছিলাম ৷ "
এই ঘটনার বছর দেড়েক পর মিস ম্যাকলাউডের চিঠিতে ( ২৮ আগষ্ট ১৮৯৮ ) স্বামীজীর দ্বিতীয়বার পাশ্চাত্য আসার সম্ভাবনার খবর জেনে স্টার্ডি মিস ম্যাকলাউডকে লিখলেন ( ১৮ অক্টোবর ১৮৯৮ ) যদি তিনি (স্বামীজি ) লন্ডনকে কর্মকেন্দ্র করেন , ' তাহলে আমি সানন্দে আমার বাড়িকে তাঁর বাসস্থান করবো ৷ কিন্তু এর প্রায় বছর খানেক পরে যখন ৩১-এ জুলাই ১৮৯৯ ,স্বামীজী লন্ডনে এসে পৌছলেন তখন তাঁকে অভ্যর্থনার জন্য স্টার্ডিকে লন্ডনের টিলবেরি ডকে দেখা গেল না ৷ . তিনি তখন তাঁর পরিবারবর্গকে নিয়ে ওয়েলসে বেড়াতে গিয়েছেন , স্বামীজী লন্ডনে আসছেন জেনেও ৷ স্বামীজী স্টার্ডির অনুপস্থিতিকে কতখানি গুরুত্বসহকারে দেখেছিলেন এটা জানা যায় না , তবে নিবেদিতা ব্যাপারটিকে হালকাভাবে নিতে পারেননি ৷ তাঁর মনে হয়েছিল স্টার্ডি বিশ্বাসঘাতক ৷================
(3)তৃতীয় পর্ব।★★★★★★
"ক্রশবিদ্ধ বিবেকানন্দ।"
স্বামী পূর্নাত্মানন্দ ।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে ,
যে স্টার্ডিকে স্বামীজি সম্পর্কে এত উচ্ছ্বসিত আমরা দেখলাম , তিনি কেন এমন আচরণ করলেন ? এটা কি কোনো আকস্মিক ঘটনা মাত্র , অথবা এর পেছনে কোনও ইতিহাস আছে ? না , স্টার্ডির পশ্চাদপসরণ কোন আকস্মিক ব্যাপার নয় ৷ যে বিবেকানন্দ আড়াই বছর আগেও স্টার্ডির সমস্ত আদর্শের মূর্ত বিগ্রহ, যাঁর মধ্যে তিনি তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সুহৃদ ও পবিত্রতম আচার্যকে পেয়েছিলেন ,সেই বিবেকানন্দকে এড়িয়ে চলার ,তাঁকে অস্বীকার করার এবং ক্রমশ তাঁর মহিমায় নানা অসত্য কালিমা লেপন করার দুর্মতিও একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল স্টার্ডির ৷ মনে হয় , এই প্রয়োজন হয়েছিল তাঁর নিজের ব্যর্থতা ও পরাজয়ের গ্লানিকে গোপন করার জন্য এবং নিজেকে বাঁচাবার জন্যই ৷ আমরা এখন স্টার্ডির সেই মানসিকতার উৎস ও স্বরূপ সন্ধান করবো ৷
১৮৯৬খ্রিস্টাব্দে ১৬ ডিসেম্বর স্বামীজি লন্ডন ত্যাগ করলেন এবং রেখে গেলেন পেছনে অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী বন্ধু ও অনুরাগী ভক্তকে ৷ আর রেখে গেলেন একটি সুসংগঠিত জনপ্রিয় ধর্মীয় আন্দোলনকে , যে আন্দোলনের নাম বেদান্ত আন্দোলন। স্বামীজীর অনুপস্থিতেই যার পরিচালনার দায়িত্ব ছিল মূলত স্টার্ডির উপর ৷ কিন্তু অচিরেই দেখা গেল স্বামীজীর কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া তো দূরের কথা , বরং তার ব্যর্থ নেতৃত্বের জন্য লন্ডনে বেদান্ত আন্দোলন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে । বাস্তব ক্ষেত্রে প্রমাণিত হলো সংগঠক হিসেবে স্টার্ডি এক মূর্তিমান ব্যর্থতা। নিবেদিতা তাই লিখেছিলেন , "স্টার্ডিকে কেউ নেতা হিসেবে গণ্য করল তা হবে এক বৃহৎভ্রান্তি ৷ "
প্রথমবার ইংল্যান্ডে এসে স্বামীজী বেদান্ত আন্দোলনের সূচনা মাত্র করে গিয়েছিলেন। সেই আন্দোলনকে স্বামীজীর মাস পাঁচেক বাদে পুনরায় ফিরে আসা অব্দি স্টার্ডি সজীব রেখেছিলেন, আর যখন স্বামীজি দ্বিতীয়বার ইংল্যান্ডে এলেন অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ সময়ের জন্য তখন আন্দোলন সত্যিই খুব জমজমাট হয়ে উঠল ৷
The work in London has been a roaring success ...স্বামীজীর নিজের ভাষায় ৷ ইংল্যান্ডে বেদান্ত আন্দোলনকে সাফল্যের সেই তুঙ্গে স্থাপন করে স্বামীজি সেখান থেকে বিদায় নিয়ে ভারতে ফিরতে চাইলেন ৷ ইতিমধ্যে ভারত থেকে তাঁর আহ্বানে এসে গেছেন তাঁর গুরুভাই স্বামী অভেদানন্দ ৷ তিনি যদিও সেখানে নতুন কিন্তু স্বামীজি ভাবলেন স্টার্ডি তো রয়েছেন সেখানে ৷ আন্দোলনকে জাগিয়ে রাখার কাজে তিনি তো অভেদানন্দ কে সাহায্য করবেন , যেমন করেছেন তাঁকে ৷ স্টাডির কাছে নিশ্চয়ই স্বামীজি সেই প্রয়োজনীয় সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পেয়েছিলেন তবে স্বামীজীর ওখানকার অনুরোধে বন্ধুরা চাননী যে , স্বামীজী সেই মুহূর্তে ইংল্যান্ড ছেড়ে চলে আসেন ৷ কিন্তু দেশের ডাক তখন যে তার কানে পৌঁছে গেছে ৷ তাছাড়া দেশেও তো তার আন্দোলনকে রূপ দিতে হবে , তাদের গতি সঞ্চার করতে হবে ৷ সুতরাং তাঁর ফিরে আসার একান্ত প্রয়োজন ছিল ৷ কিন্তু শুধু কি ভারতের আকর্ষণ আর ভারতের কাজকে সংগঠিত করার জন্যই স্বামীজি ইংল্যান্ডে তার প্রবর্তিত আন্দোলনের সেই তুঙ্গ মুহূর্তে ভারতে পাড়ি দিতে ব্যস্ত হয়েছিলেন ? তিনি স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণের নির্দেশ পেয়েছিলেন ৷ স্বামীজি লিখছেন , " অবশ্য এখানকার সকলেই মনে করছেন চূড়ান্ত এই সাফল্যের মুখেএখানকার কাজটি ছেড়ে যাওয়া নির্বুদ্ধিতা হবে , কিন্তু আমার প্রিয় প্রভু যে আমাকে বলছেন , " ওই বুড়ো দেশটায় ফিরে চল৷ " আমি তার আদেশ পালন করছি মাত্র ৷
অবশেষে যাত্রার দিনটি এলো ১৬-ই ডিসেম্বর ১৮৯৬। স্বামীজীকে বিদায় দিয়ে স্টাডির মনের অবস্থা কি হয়েছিল আর স্বামীজীর মধ্যে তিনি কি পেয়েছিলেন সে সম্পর্কে তার নিজের কথা আমরা উল্লেখ করেছি ৷ স্বামীজি তাঁর ইংল্যান্ডের কাজ সম্পর্কে স্বদেশে ফিরে এসেই মাদ্রাজে গভীর প্রত্যয়ের সঙ্গে বললেন , " যদি আমি আগামীকাল মারাও যাই এবং কোন সন্ন্যাসীকে আর সেখানে নাও পাঠাতে পারি তাহলেও ইংল্যান্ডের কাজ চলবে ৷ কলকাতায় ফিরে এসেও তার সেই প্রত্যয় প্রতিধ্বনিত হলো ৷
প্রসঙ্গত , ইংল্যান্ডে স্বামীজি তাঁর জনপ্রিয়তাকে এবং তাঁর প্রবর্তিত বেদান্ত আন্দোলনকে কোনও সমুচ্চ স্তরে রেখে এসেছিলেন , স্বামীজীর প্রথমবার পাশ্চাত্য ভ্রমণের শেষেই লন্ডন থেকে ভারতে ফেরার এক বছর পর তার আকার দেখেছিলেন ভারতের অন্যতম প্রধান জাতীয়তাবাদী নেতা এবং ব্রাহ্মসমাজের বহুমানিত সদস্য বিপিনচন্দ্র পাল ৷ তাঁর নিজের একটি অভিজ্ঞতা তিনি 'ইন্ডিয়ান মিরর ' পত্রিকায় ১৫-ই ফেব্রুয়ারি ১৮৯৮ তারিখের চিঠিতে লিখেছিলেন , "কাল সন্ধ্যায় লন্ডনের দক্ষিণ প্রান্তে এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা দিতে যাইতেছিলাম ৷ কিন্তু পথের নিশানা হারাইয়া ফেলায় রাস্তার এক কোনে দাঁড়াইয়া কোন্ দিকে যাইব ভাবিতেছিলাম। এমন সময় একজন ভদ্রমহিলা একটি শিশুকে সঙ্গে লইয়া আমার নিকটে আসিলেন , মনে হইল আমাকে পথ দেখাইবার অভিপ্রায়ে আসিয়াছেন৷ তিনি আমাকে বলিলেন , "মহাশয় , নিশ্চয়ই পথ খুঁজিয়া পাইতেছেননা ? আমি সাহায্য করতে পারি কি ? " তিনি আমাকে পথ দেখাইয়া দিয়া বলিলেন , " কাগজে দেখিয়াছি আপনি লন্ডনে আসিতেছেন (সম্ভবত লন্ডনের কোন পত্রিকায় তাঁর লন্ডনের আসার সম্ভাবনা জানিয়ে কোন সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল ) আপনাকে প্রথম দেখা মাত্রই আমি আমার ছেলেকে বলিতেছিলাম , "ওই দেখো , স্বামী বিবেকানন্দ " | তাড়াতাড়ি ট্রেন ধরিবার জন্য অতি দ্রুত চলিয়া যাইতে বাধ্য হইয়া ছিলাম ৷ তাঁহাকে বলিবার সময় পাই নাই যে , আমি স্বামী বিবেকানন্দ নহি I "
======================
(4)চতুর্থ পর্ব।★★★★★★★
"ক্রশবিদ্ধ বিবেকানন্দ।"
স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ ।
স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ মহারাজের কথায় আবার আমরা ফিরে আসছি ৷ স্বামীজী যখন যেখানে থাকতেন তখন তাঁর কাছাকাছি যে-সব মানুষ থাকতেন। তাঁরা শিষ্য হোন বা অনুরাগী হোন অথবা বন্ধু হোন সকলকেই একটি প্রাণময় প্রেরণায় ও উৎসাহে তিনি জাগিয়ে রাখতেন ৷ সকলের মধ্যে একটা কর্মচাঞ্চল্যের জোয়ার বইয়ে দিতেন তিনি ৷ কেউ কেউ সেই উত্তাপকে চিরকালের মতন অন্তরের মধ্যে গ্রহণ করতে সমর্থ ছিলেন। যেমন ছিলেন মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল (পরবর্তীকালে ভগিনী নিবেদিতা ) হিসাবে পরিচিত হন ৷ আবার কাউকে দেখা যায় , উত্তাপের উৎস সরে যাওয়া মাত্রই নিস্তেজ -নিষ্প্রাণ
হয়ে পড়তে ৷ যেমন স্টার্ভির ক্ষেত্রে হয়েছিল ৷ স্বামীজী যতক্ষণ কাছে ছিলেন স্টার্ডি অনুপ্রেরনায় ছিলেন ৷ স্টার্ডি হয়তো ভাবছেন তাঁর নিজের প্রচেষ্টা ও সংগঠন - ক্ষমতা ইংল্যান্ডে স্বামীজীর সাফল্যের একটি প্রধান স্তম্ভ ৷ কিন্তু স্বামীজি লন্ডন ছাড়ার পর থেকেই তিনি ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে পারছিলেন ইংল্যান্ডে বেদান্ত সাফল্য এবং বিবেকানন্দ ,এ - দুয়ের সম্পর্ক কি এবং বেদান্ত প্রচারের ক্ষেত্রে বিবেকানন্দ নামক ওই ব্যক্তিটির প্রত্যক্ষ উপস্থিতির মূল্য কতখানি ৷ মোটকথা স্বামীজীর অনুপস্থিতে অল্পদিনের মধ্যেই লন্ডনের কাজের হাল খুব খারাপ অবস্থায় পৌঁছে গেল ৷ লন্ডনের কাজের শোচনীয় অবস্থার জন্য সংগঠক হিসেবে স্টার্ডির ব্যর্থতায় যে দায়ী। একথা সম্ভবত অনেকেই সেখানে তখন বলাবলি করতে আরম্ভ করেছিলেন ৷ তাতে বিচলিত হয়ে স্টার্ডি তখন স্বামীজীকে তাড়াতাড়ি লন্ডনে ফিরে আসার জন্য বারংবার লিখতে থাকেন ৷ স্বামীজী ভাবছিলেন আসবেন কি না ৷ নিবেদিতাকে লেখা ২৩ জুলাইয়ের এক চিঠিতে সে সংবাদ পাওয়া যায়। কিন্তু স্বামীজীর পক্ষে তখন যাওয়া মোটেই সম্ভব হচ্ছিল না ৷ কারণ ভারতের কাজকে তখনও তিনি আশনুযায়ী রূপ দিতে পারেননি ৷ নিবেদিতাকে লেখা ওই চিঠিতে স্বামীজী লিখেছেন সে-কথা ," আমি তোমার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত যে , আমি ইংল্যান্ডে গেলে সেখানকার কাজ আবার জমে উঠবে , কিন্তু এখানকার যন্ত্রটি কিছুটা সচল না হলে এবং আমার অনুপস্থিতিতে যন্ত্রটিকে চালু রাখার মত অনেকে আছে সে বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে আমার পক্ষে ভারতবর্ষ থেকে যাওয়া উচিত হবে না ৷ "স্বামীজীর লন্ডনে না আসায় স্টার্ডি স্বামীজীর উপর ভীষণ চটে যান ৷হয়তো না আসার জন্য স্বামীজীর যুক্তিকে উনি বিশ্বাসই করেননি । রেগে গিয়ে স্টার্ডি স্বামীজিকে চিঠি লেখাই বন্ধ করে দেন ৷ কিছুদিন নীরব থাকার পর স্টার্ডির একটি চিঠি পান স্বামীজি ২৮-এ জুলাই যার উল্লেখ করে তিনি নিবেদিতাকে লেখেন ( ২৯ জুলাই ১৮৯৭ ) ,"শেষ পর্যন্ত স্টার্ডির কাছ থেকে একখানি পত্র পেয়ে খুশি হয়েছি , কিন্তু চিঠিটি বড় রূঢ়এবং শীতল ৷ মনে হচ্ছে লন্ডনে কাজ ভেঙ্গে পড়ায় সে হতাশ হয়েছে ৷ "
শুধু ভারতের কাজ এবং শারীরিক প্রতিকূলতা ছাড়াও আরও একটি কারণেও স্বামীজীর বিদেশযাত্রা তখন সম্ভবপর ছিল না বলে আমরা মনে করি ৷ যদিও তার উল্লেখ স্বামীজি অন্তত প্রকাশ্যে কখনো করেছেন বলে জানা যায় না ৷ স্টার্ডি স্বামীজীকে তাড়াতাড়ি লন্ডনে ফিরে আসতে ঘনঘন তাগিদ দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং স্বামীজি না যাওয়ায় রেগে আগুন হচ্ছিলেন ৷ কিন্তু বিদেশ যাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ কিভাবে একজন সন্ন্যাসী রাতারাতি জোগাড় করবেন সে কথা স্টাডি ভেবেছিলেন কি ? বিদেশযাত্রর আর্থিক সংগতির ব্যাপারটিও স্বাভাবিকভাবেই স্বামীজীর ইংল্যান্ড না যাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল l
স্বামীজীর সম্পর্কে স্টার্ডির অসন্তোষকে ধূমায়িত হতে সাহায্য করেছিল তাঁর একটি পারিবারিক কারণও ৷ স্বামীজীর মিসেস অলিবুলকে চিঠি লেখার ( ১৯ আগস্ট )কয়েক মাস পরে ৭-ই ডিসেম্বর স্টার্ডি (সম্ভবত সপরিবারে ) বিশ্বভ্রমনে বেরিয়েছিলেন | স্বামীজী সে কথা জানতে পেরে ( স্টার্ডির কাছ থেকে অথবা অন্য কোনো সূত্রে, সঠিক তথ্য জানা যায় না ) স্টার্ডিকে আমন্ত্রণ জানালেন ভারতে আসতে ৷ মেরি লুইস বার্কের অনুমান যে , স্বামীজী সম্ভবত স্টার্ডিকে তাঁর নিবেদিতা প্রভৃতির সঙ্গে আসন্ন কাশ্মীর ভ্রমনে সঙ্গী হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন ৷ স্টার্ডি ভারতবর্ষের নিকটবর্তী কোন স্থান থেকে স্বামীজীকে চিঠিতে জানালেন যে , তিনি ভারতে আসছেন না ৷ ভারতের প্রান্তে এসেও ভারতে না আসার কারণ স্টার্ডি কী জানিয়েছিলেন তা জানার এখন কোন উপায় নেই , কারন স্টার্ডির সেই পত্রটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি ৷ তবে মিসেস ওলি বুলকে লেখা স্বামীজীর ৪-ই এপ্রিল ১৮৯৮ তারিখের চিঠিতে স্টার্ডি সম্পর্কে ঐ প্রসঙ্গে স্বামীজীর মন্তব্য থেকে বোঝা যায় স্টার্ডির ভারতে না আসার পিছনে কোন ঘটনা কাজ করেছে ৷ স্বামীজি বলতে চেয়েছেন , স্টার্ডির বিবাহ শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের শান্তি ও আনন্দ অনেকখানি ছিনিয়ে নেয়নি , হরণ করে নিয়েছে তাঁর কর্মজীবনের স্বাধীনতার এক বৃহৎ অংশও ৷
====================
(5)পঞ্চম পর্ব ।★★★★★
"ক্রশবিদ্ধ বিবেকানন্দ।"
স্বামী পূর্নাত্মানন্দ ।
ভারতীয় শাস্ত্রা- দিতে উচ্চ প্রশংসিত আকুমার ব্রহ্মচর্যের প্রতি ছিল স্টার্ডির একটি বিশেষ আকর্ষণ | জীবনে বিবাহ করবেন , না ব্রহ্মচারীর জীবন -যাপন করবেন ..... এই বাসনা নিয়ে তিনি এসেছিলেন ভারতবর্ষে । ভারতবর্ষে এসে কিছুকাল সাধুসঙ্গ করেছেন, হিমালয় অঞ্চলে যোগাভ্যাস করেছেন এবং অত্যন্ত কঠোর জীবন যাপন করেছেন ..... তার উল্লেখ আমরা আগেই করেছি l কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে সেই স্টার্ডি ভারত থেকে ইংল্যান্ডে ফেরার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে শুধু বিবাহই করলেন না , অনতিবিলম্বে দুটি সন্তানের জনকও হলেন | স্ত্রী লুসি স্টার্ডির জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল ৷ প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ করা যায় , লন্ডনে আসার পর থেকে নিউইয়র্কএ যাওয়া পর্যন্ত স্বামী অভেদানন্দ স্টার্ডির বাড়িতেই অতিথি হিসেবে ছিলেন ৷
বিবাহোত্তর জীবনে স্টার্ডি ক্রমশ উপলব্ধি করেছিলেন বিবাহ তাঁর জীবনের গতিপথকে বিপরীত রেখায় নিয়ে গিয়েছে ৷ স্বামীজীর শরীর ত্যাগের সাড়ে ছ' মাস পর ( ১৮-ই জানুয়ারী ১৯০৩ ) ম্যাকলাউকে লেখা চিঠিতে নিজের আকাঙ্ক্ষিত যোগী-জীবনের ব্যর্থতার রূপটি স্টার্ডি তীব্র আত্মবিদ্রুপের সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন | তিনি লিখেছিলেন ," আমার মনে পড়ছে ( ১৮৯৪ খ্রীঃ প্রথম পাদে ) ভারতবর্ষ থেকে শেষবারের মতো চলে আসার সময় একজন মহিলা জ্যোতিষীর হস্ত গণনাকে কি বিদ্রুূপ এবং ঘৃনার সঙ্গেই না নিয়েছিলাম যখন তিনি আমার সম্পর্কে বলেছিলেন , "তোমার দুবার বিয়ে হবে , সন্তানাদি হবে এবং রমনীসূত্রে অনেক দুঃখ ভোগ করবে । ( এই ঘটনার উল্লেখ করছি ) এই কারনে যে , এটি আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় আমার তখন নিজের উপর যে চূড়ান্ত আস্থা ছিল তার কথা , যে জীবন (অর্থাৎ সংসার ত্যাগী যোগী- জীবন ) আমি অবলম্বন করতে চেয়েছিলাম , সেই জীবন সম্পর্কে আমার আত্মবিশ্বাসের কথা এবং আমার সেই নিষ্কম্প
ধারনার কথা যে রমনী- সম্পর্কিত যাবতীয় দুর্বলতা এবং প্রভাবকে আমি সম্পূর্ণভাবে অতিক্রম করতে পেরেছি এবং ভবিষ্যতেও নিশ্চিত ভাবেই সেইভাবটি অক্ষুন্ন রাখতে পারব ৷ "
স্টার্ডি তাঁর ভবিষ্যৎ শুনে ব্যঙ্গ ও ঘৃনার হাসি দিয়ে জ্যোতিষী বচনকে যখন . উপেক্ষাভরে গ্রহণ করছিলেন , তখন স্টার্ডির বিধাতা অলক্ষ্যে হাসছিলেন স্টার্ডির শূন্যগর্ভ আত্মবিশ্বাস আর মিথ্যা আত্মম্ভরিতার মস্ত ফানুসের ছিদ্রটির দিকে তাকিয়ে ৷
মূল প্রসঙ্গ থেকে আমরা একটু সরে গিয়েছি অবশ্য , প্রসঙ্গের প্রয়োজনে I আমরা ইতিপূর্বে দেখে এসেছি স্টার্ডি ১৮৯৭
খ্রিস্টাব্দে শেষে বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে ভারতবর্ষের কাছাকাছি এসেও স্বামীজীর আমন্ত্রণ সত্ত্বেও ভারতে আসেন নি ৷ স্বামীজি ইংল্যান্ডে না যাওয়ায় স্বামীজীর উপর স্টার্ভির অভিমান এর পেছনে নিশ্চয়ই ছিল ৷ স্টার্ডির ভারতে আসা এবং স্বামীজীর সঙ্গে আবার সাক্ষাতের ব্যাপারটি হয়তো বা লুসিরও অভিপ্রেত ছিল না ৷ অতিমাত্রায় স্ত্রীর দ্বারা পরিচালিত হওয়াতে স্ত্রীর ইচ্ছার বাইরে কিছু করার সাহস স্টার্ডির ছিল না I তবে স্বামীজীর আহবানে সাড়া দিতে না পারার বেদনা তাঁর মনে ছিলই | যেটা স্বামীজী স্টার্ডির চিঠি থেকে বুঝতে পেরেছিলেন ৷ তাই ওলি বুলকে স্টার্ডির দুরবস্থার জন্য সমবেদনা জানিয়েছিলেন ৷ একদিকে স্বামীজীর আহ্বান , অন্য দিকে স্ত্রীর আপত্তি , এই দোটানায় স্টার্ডি শেষ পর্যন্ত স্ত্রীর ইচ্ছার কাছেই নতি স্বীকার করেছিলেন ৷ অবশ্য স্বামীজির কাজে সাহায্য করা এবং তাঁকে নিজের আবাসে আমন্ত্রণ জানানোর ব্যাপারে কখনো কখনও নিজের ইচ্ছাকে স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করার চেষ্টা তিনি করেছেন ,অন্তত তা করার কথা তিনি ভেবেছেন | পূর্বোক্ত ঘটনার কয়েকমাস পরে মিস ম্যাকলাউডের চিঠিতে ( ২৮ আগষ্ট ১৮৯৮ ) স্টার্ডি জানতে পারলেন যে , স্বামীজি আবার পাশ্চাত্যে আসার কথা ভাবছেন ' । স্টার্ডিকে খবরটি জানাতে স্বামীজিই ম্যাকলাউডকে অনুরোধ করেছিলেন | ম্যাকলাউডকে চিঠির উত্তর দিতে বেশ দেরি করলে স্টার্ডি। কারণ চিঠিতে স্বামীজীর যে পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল সে সম্পর্কে সংসারী স্টার্ডি অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করছিলেন I যাইহোক , ১৮-ই অক্টোবর ১৮৯৮ ম্যাকলাউডকে স্টার্ডি লিখলেন ,আপনার চিঠিতে স্বামীজি এবং তাঁর (পাশ্চাত্য আসার ) পরিকল্পনা সম্পর্কে যে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদটি এসেছে সেই ব্যাপারে ( আমার পক্ষে কতটা স্বামীজীর সাহায্যে আসা সম্ভব হবে ) ভাবছিলাম | তাই চিঠির উত্তর দিতে এতো সময় লেগে গেল ৷
স্টার্ডি ম্যাকলাউডকে লিখেছিলেন ,তিনি (স্বামীজি ) যদি লন্ডনকে কর্ম কেন্দ্র করা ঠিক করেন তাহলে আমার বাড়িকে তিনি বাসস্থান করলে আমার পক্ষে তা আনন্দের ব্যাপার হবে ৷ আর যদি তিনি চান আমি তাঁর জন্য লন্ডনে) অন্য কোন সুবিধাজনক স্থানের ব্যবস্থা করি , তাও আমি সানন্দে করব ৷ উভয় ব্যবস্থার যেকোনটিতেই আমি সর্বদাই তাঁর সেবায় নিজেকে নিযুক্ত রাখবো এবং তাঁর জন্য সবকিছু করতে পারলে আমি যে কত আনন্দ পাব তা বলে বোঝাতে পারছি না ৷ .
স্বামীজী সম্পর্কে আপনি যা লিখেছেন তা সমস্তই আমি ভালোভাবে বুঝি ৷ আমি ভালভাবেই জানি যে , যারই বাড়িতে তিনি বাস করুক না কেন তাঁকে ( থাকা বা কাজকর্মের ব্যাপারে ) সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া উচিত ৷ আমি এও জানি , অনুকূল বন্ধুত্বপূর্ণ খোলামেলা পরিবেশ তিনি কত পছন্দ করেন ৷ এ সমস্ত স্বাধীনতাই তিনি আমার বাড়িতে পাবেন। শেষের বাক্যটি লেখার পর স্টার্ডির হয়ত হঠাৎ স্মরণে এসেছে যে , সেই স্বাধীনতা' দেওয়ার অধিকার এখন আর তাঁর একার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করেনা ৷ আগ্রহ ও ঐকান্তিকতা থাকলেও লুসি এখন একটি প্রায় দুর্লঙ্ঘ্য প্রতিবন্ধক | সেই আত্মগ্লানিতে দগ্ধ হয়ে অতপর লিখলেন, আমার জীবনে অনেক জিনিসই এসেছে বড় দেরিতে I একটা সময় ছিল যখন আমি সংসারের যাবতীয় বন্ধন ও দায়িত্ব থেকে মুক্ত ছিলাম I সে সময়ে স্বামীজীর গুরুভাইদের সঙ্গে দেখা না হয়ে স্বয়ং স্বামীজীর সঙ্গে আমার দেখা হওয়া উচিত ছিল ৷ এবং তাহলে সকলের পক্ষে তা কত যে কল্যাণপ্রদ হতো !! কিন্তু প্রারব্ধ কর্মের ফলভোগ থেকে কারুর অব্যাহতি পাওয়ার উপায় নেই ৷ তাই মৃত্যু হল গুডউইনের আর আমার হলো এই দুর্গতি ৷ "
এখানে লক্ষ্য করার বিষয় যে ,এখনও স্টার্ডি স্বামীজি সম্পর্কে অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ৷ এরপরেও কিছুকাল স্টার্ডির সেই মনোভাবটি থাকবে সেটা আমরা লক্ষ্য অবশ্যই করব .... তবে তা কতখানি অকৃত্রিম ছিল বলা শক্ত I কারণ তাঁর পরবর্তী আচরন অন্যরকম হবে ,আমরা সেটা লক্ষ্য করে দেখব ৷ ইতিমধ্যে স্বামীজীর প্রস্তাবিত পাশ্চাত্য যাত্রার সময় পিছিয়ে গিয়েছে । কারণ স্বামীজীর শারীরিক অসামর্থ্য। লন্ডনের কাজের ব্যর্থতার ব্যাপারে স্বামীজীর অনুপস্থিতিতে টাকা-পয়সার অভাব একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাই লন্ডন কিংবা আমেরিকা যেখানেই হোক গিয়ে অর্থাদি সংগ্রহ করে লন্ডনের বেদান্ত- আন্দোলনকে পুনরায় সজীব করে তোলার জন্য ব্যস্ত হয়েছিলেন স্বামীজি। এ সম্পর্কে ক্রিষ্টিন , ওলি বুল , ম্যাকলাউড , মেরি হেলকে এই সময় লেখা তাঁর বিভিন্ন চিঠিপত্রে এবং গুরুভাইদের সঙ্গে আলোচনায় আমরা প্রয়োজনীয় সংবাদ পাই। যাই হোক, ওই বছর এপ্রিল মাসে স্বামীজি ইংল্যান্ডে আসছেন একথা স্টার্ডিকে জানানো হলে স্টার্ডি স্বামীজীকে সাদর আমন্ত্রণ জানান। এ সম্পর্কে ম্যাকলাউভকে স্টার্ডি ২১ মার্চ তারিখে লেখেন , স্বামীজি তাঁর প্রস্তাবিত ( পাশ্চাত্য জাতির উদ্দেশ্যে ) মাদ্রাজ রওনা হওয়ার আগে আমার চিঠি পাবেন না ৷ তবে আশা করছি , ভারত ছাড়ার আগেই চিঠিটি তিনি পেয়ে যাবেন। চিঠিটি পেলে এখানে কি করতে পারবেন সে সম্পর্কে কিছুটা ভরসা নিয়ে স্বামীজী রওনা হতে পারবেন। তাছাড়া এখানকার বন্ধুরা তাঁকে কি রকম পার্থনা দেবেন সে বিষয়ে তাঁর কোনো রকম ভাবনা থাকলে চিঠিটি তাকে সে সম্পর্কেও নিশ্চিন্ত করবে । অর্থাৎ স্টার্ডি স্বামীজীকে জানিয়েছিলেন যে , লন্ডনে স্বামীজি ফিরে এলে সেখানে আন্দোলন আবার শক্তিশালী হয়ে ওঠবে এবং লন্ডনস্থ বন্ধুরা সবাই গভীর আগ্রহে স্বামীজীর অপেক্ষায় আছেন। স্টার্ডি নিজেও যে ব্যাপারটিতে খুবই আগ্রহান্বিত সেটিও তাঁর এই চিঠিতে স্পষ্ট। এর আগে স্বামীজী লন্ডনে না আসায় তাঁর মনে স্বামীজী সম্পর্কে যে ক্ষোভ জমে ছিল , মনে হয় তার অনেকটাই তখন চলে গিয়েছে। তবে আমাদের ধারণা , এটি সম্ভব হয়েছিল ম্যাকলাউড এবং ওলি বুলের সঙ্গে তাঁর এই পর্বে সাক্ষাৎ এবং অন্তরঙ্গতার ফলে l ফেব্রুয়ারীতে ম্যাকলাউড এবং ওলি বুল আমেরিকা যাওয়ার পথে ভারত থেকে লন্ডনে এসেছিলেন
লন্ডনে বেদান্ত - আন্দোলনের যে হাল করে এনেছিলেন স্টার্ডি তাতে তিনি ভালভাবেই বুঝে গিয়েছিলেন যে ,কোনওরকমে স্বামীজীর থেকে সরে থাকে আসতেই হবে তাঁকে । তাতে তিনি ওই বিষয়ে লন্ডনের বন্ধুদের কাছে তাঁর দায়িত্ব এড়াতে পারবেন | কিন্তু স্বামীজী সম্পর্কে এতদিন প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে তিনি যেসব ভালো ভালো কথা বলেছেন সেগুলি রাতারাতি অস্বীকার করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না তিনি সেটা বুঝেছিলেন । সুতরাং তাঁকে আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হলো ৷
====================
(6)ষষ্ঠ পর্ব।★★★★★★★
"ক্রশবিদ্ধ বিবেকানন্দ।"
স্বামী পূর্নাত্মানন্দ ।
স্টার্ডির ব্যর্থতার গ্লানি একটি কারণে বিশেষভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল .... তা হল , .... ' স্বামীজীর তথা ভারতের কাজে নিবেদিতার আত্মোৎসর্গ ৷ স্বামীজী এবং তাঁর কাজে নিবেদিতার দ্বিধাহীন আনুগত্যে স্টার্ডি তাঁর সম্পর্কে ক্রমশ ঈর্ষাপরায়ন হয়ে উঠছিলেন ৷ স্বামীজীর লন্ডন ত্যাগের পর স্টার্ডি স্বামীজীকে যত চিঠি লিখেছেন তার প্রায় প্রত্যেকটি থাকত শুধু অভিযোগ আর হতাশার কথা | অন্যদিকে নিবেদিতা ইংল্যান্ড থেকে স্বামীজীকে যেসব চিঠি লিখতেন , তাতে থাকত একটা প্রবল আত্মবিশ্বাস এবং উৎসাহের সুর যা স্বামীজীকে আশ্বস্ত করত ৷
ভারতে আসার পর নিবেদিতা পরম উৎসাহে স্বামীজীর কাজে নিজেকে যুক্ত করেছেন , কোনও সমস্যাকেই সমস্যা বলে গ্রাহ্য করেননি এবং সর্বোপরি স্বামীজীর কাজের জন্য নিজের দেশ , আত্মীয়-স্বজনের মায়া ত্যাগ করেছেন ; বিসর্জন দিয়েছেন ব্যক্তিগত সুখ- স্বাচ্ছন্দ্য এবং ভবিষ্যতের প্রশ্ন , এককথায় তাঁর সবকিছু I ভারত থেকে নিবেদিতা যত চিঠি লিখেছেন স্টার্ডিকে তাও ছিল আশা ও উৎসাহের সুরে ভরপুর | মিসেস বুলকে স্টার্ডি সেকথা নিজেই লিখেছিলেন ৷ ব্যর্থ এবং হতাশাক্লিষ্ট স্টার্ডি নিবেদিতার উৎসাহ-উদ্দীপনাকে ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারছিলেন না ৷ স্টার্ডি যখন পিছিয়ে পড়ছেন তখন নিবেদিতার অক্লান্ত উদ্যমের কথা এবং তাঁর প্রতি চিঠিতেই স্বামীজী সম্পর্কে তাঁর গভীর শ্রদ্ধা - ভক্তির প্রকাশ দেখে সতীর্থ হিসাবে স্টার্ডি একটি হীনমন্যতায় আক্রান্ত হয়েছিলেন | তাছাড়া লন্ডনে স্টার্ডি ছিলেন স্বামীজীর দক্ষিণ হস্ত | ক্রমশ স্বামীজীর শিষ্যদের মধ্যে নিবেদিতা যেন ভারতবর্ষে সেই স্থানটি গ্রহণ করছেন , কল্পনা করে স্টার্ডি অন্তরে একটা জ্বালা অনুভব করতে শুরু করেছিলেন ।
মার্চ (১৮৯৯ ) মাসে স্টার্ডি , নিবেদিতা এবং ম্যাকলাউডের কাছ থেকে জানতে পারলেন যে , স্বামীজি এপ্রিলে স্বামী তুরীয়ানন্দকে নিয়ে লন্ডন আসতে চান ৷ ১৩-ই এপ্রিল মিসেস অলি বুলকে লিখলেন যে , ইতিমধ্যে স্বামীজীর একটি ছোট চিঠি তিনি পেয়েছেন I তাতে স্বামীজি তাঁর ( স্টার্ডির )লন্ডনে আসার জন্য আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন ৷ তবে স্বাস্থ্যের কারণে তাঁর রওনা হতে একটু দেরি হবে ৷ ওই চিঠিতে স্টার্ডি একথাও লিখলেন , " তুরীয়ানন্দ যখনই আসুন না কেন , তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে আমি তৈরী হয়ে আছি ৷ আমার মনে হয় , একথা লেখা বাহুল্যমাত্র, তবু আমি কাল যখন ভারতে চিঠি লিখব তখন আবার তা (স্বামীজীকে ) জানাব ৷
কিন্তু ওই চিঠি লেখার তিনদিন পর (১৬-ই এপ্রিল ) স্টার্ডি মিসেস বুলকে আর একটি চিঠিতে যা লিখলেন তাতে অবাক হতে হয় ৷ কারণ তা ম্যাকলাউড এবং অলি বুলকে এতদিন স্টার্ডি স্বামীজি সম্পর্কে যা বলেছেন তার সঙ্গে যে শুধু মেলে না তাই নয় , স্টার্ডির প্রথমাবধি স্বামীজি সম্পর্কে যে ধারনা আমরা দেখে এসেছি তার সঙ্গে তো বটেই। তিনদিন আগে পর্যন্ত তিনি যা বলেছেন তার সঙ্গেও মোটেই খাপ খায় না ! স্টার্ডি লিখলেন ,' আমার পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি যে , স্বামীজি যেইমাত্র এখানে এসে পৌঁছবেন সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর অর্থের দরকার হবে | আর এবার দুজনের (স্বামীজী ও স্বামী তুরীয়ানন্দের ) খরচ যোগাতে হবে ৷
আমার বর্তমানে যা সাংসারিক খরচ কমানোও এখন আমার পক্ষে সম্ভব নয়, তা করতে গেলে (আমার পরিবারের ) অন্যান্যদের অসুবিধা হবে এবং সম্ভবত তা করাটাও ঠিক হবে না | তাছাড়া , আমার পক্ষে সংসার চালিয়ে এমন কিছু টাকা থাকবে না , যা আমি নিজে স্বামীজীর জন্য দিতে পারব ৷ "
সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে , স্টার্ডি এতদিন ভিতরে ভিতরে স্বামীজীর সম্পর্কে একটি অসন্তোষ পোষণ করে চলেছেন এবং তার কিছুটা প্রকাশ হয়ে পড়ল ৷ তবে এখনও তিনি ঝোলা থেকে বিড়ালটি ঠিক বের করলেন না । মেরি লুইস বার্কের গবেষণা থেকে জানা যায় যে , স্বামীজি সম্পর্কে স্টার্ডির এই অসন্তোষের মূলে বিশেষ ভাবে কাজ করছে নিবেদিতা সম্পর্কে স্টার্ডির অকারণ অসূয়াপরতা ৷
ইতিমধ্যে টিকিট না পাওয়া যাওয়ায় এবং আর্থিক কারণে স্বামীজীর যাওয়া পিছিয়ে যায়। টিকিট হয় ২০ জুনের ,এইসময় নিবেদিতাকে দিয়ে স্বামীজি যে বালিকা বিদ্যালয় শুরু করেছিলেন সেটি আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে চলছিল ৷ ক্রমশ তার তীব্রতা বেড়ে চলায় স্বামীজি নিবেদিতাকে তাঁর সঙ্গে ইংল্যান্ডে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে বলেন , যাতে নিবেদিতা সেখানে তাঁর বিদ্যালয়ের জন্য স্বাধীনভাবে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন ৷ সুতরাং নিবেদিতাও স্বামীজি ও তুরীয়ানন্দজির সঙ্গে যাবেন ঠিক হল ৷ প্রয়োজন হলে স্বামীজি নিবেদিতাকে আমেরিকাতেও কোনও বক্তৃতা -প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়ে অর্থ সংগ্রহের কথা ভেবেছিলেন। যাইহোক, স্বামীজী রা যে ২০ জুন রওনা হচ্ছেন তা স্টার্ডিকে যথা সময়ে জানানো হল ৷ নিবেদিতাও স্বামীজীর সঙ্গে ইংল্যান্ডে আসছেন জেনে স্টার্ডি শঙ্কিত হয়ে থাকতে পারেন ৷ তিনি হয়তো ধরেই নিয়েছিলেন স্বামীজি নিবেদিতাকে ইংল্যান্ডে নিয়ে আসছেন তাকে স্টার্ডির স্থলাভিষিক্ত করতে ৷ সুতরাং স্টার্ভি নিবেদিতাকে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতে আরম্ভ করলেন এবং নিবেদিতার উপর তার এই রাগটি গিয়ে পড়ল স্বামীজীর উপরে। অথচ স্টার্ডির এই অদ্ভুত মনস্তত্ত্বের খবরটি স্বামীজি অথবা নিবেদিতা কেউই অবহিত ছিলেন না ৷
রওনা হবার সঙ্গে সঙ্গে (২০ জুন ১৮৯৯ )স্বামীজি মিস ম্যাকলাউডের কাছে টেলিগ্রাম পাঠালেন, started . Wire sturdy . ' স্বামীজীর নির্দেশমতো মিস ম্যাকলাউড স্টার্ডিকে সে সংবাদ জানিয়ে দিলেন ৷ রওনা হওয়ার পর স্বামীজি স্টার্ডিকে কোনও চিঠি লিখেছিলেন কিনা সেটা জানা না গেলেও মাদ্রাজে পৌঁছে তাঁদের রওনা হওয়ার কথা জানিয়ে এবং স্বামীজি ও স্বামী তুরীয়ানন্দের থাকার ব্যবস্থা করার অনুরোধ করে নিবেদিতা স্টার্ডিকে চিঠি দিয়েছিলেন। ম্যাকলাউডকে লেখা নিবেদিতার ২৮-এ জুনের চিঠিতে দেখি নিবেদিতা আশা করছেন ইতিমধ্যে স্টার্ডি স্বামীজীদের বাসস্থান প্রভৃতির ব্যবস্থার ব্যাপারে ম্যাকলাউডের পত্রও পেয়ে গিয়েছেন ৷ যাই হোক , স্টার্ডি জাহাজের ঠিকানায় পোর্ট সৈয়দে স্বামীজীকে পত্র লিখলেন। স্টার্ডির এই পত্রটি পাওয়া যায়নি ,তবে পত্রটি পেয়ে পোর্ট সৈয়দ থেকে ১৪-ই জুলাই তারিখে স্টার্ডিকে স্বামীজী যে উত্তর দিয়েছিলেন তা থেকে মনে হয় যে , স্টার্ডি তাঁকে লন্ডনে কাজ করার জন্য সহৃদয় আমন্ত্রণই জানিয়েছিলেন এবং স্বামীজি স্টাডিকে পূর্বের মত তাঁর অনুবর্তী , স্নেহপরায়ণ ও বেদান্ত- আন্দোলনের ব্যাপারে সাহায্য ও সহযোগিতায় উন্মুখ দেখবেন বলে আশা করেছিলেন। স্বামীজীর পত্রের প্রাসঙ্গিক অংশ এখানে আমরা তুলে ধরছি।
" তুমি নিশ্চয়ই জানো যে , উপস্থিত লন্ডনে আমার বন্ধুদের অনেকেই নেই ৷ তাছাড়া মিস ম্যাকলাউড আমায় (আমেরিকা ) যাওয়ার জন্য খুব পীড়াপীড়ি করছেন I বর্তমান পরিস্থিতিতে ইংল্যান্ডে থাকা যুক্তিসঙ্গত মনে হচ্ছে না। অধিকন্তু আমার আয়ু ফুরিয়ে এল, অন্তত আমাকে এটা সত্য বলে ধরে নিয়েই চলতে হবে ৷ আমার বক্তব্য এই যে , আমরা যদি আমেরিকায় সত্যই কিছু করতে চাই , তবে এখনই আমাদের সমস্ত বিক্ষিপ্ত প্রভাবকে যথাবিধি নিয়ন্ত্রিত না করতে পারলেও অন্তত একমুখী করতেই হবে। তারপর মাস কয়েক পরেই আমি ইংল্যান্ডে ফিরে আসার অবকাশ পাব এবং ভারতবর্ষে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত একমনে কাজ করতে পারব। আমার মনে হয় , আমেরিকার কাজ গুছিয়ে আনার জন্য তোমার আসা একান্ত প্রয়োজন I অতএব যদি পারো তো আমার সঙ্গেই তোমার চলে আসা উচিত। তুরীয়ানন্দ আমার সঙ্গে আছে ,তুমি যদি আমেরিকায় নাও আসতে পার , তবুও আমার যাওয়া উচিত , কি বল ?"
আমাদের অনুমান , স্টার্ডি তাঁর চিঠিতে স্বামীজি এবং তুরীয়ানন্দজীর থাকার ব্যাপারে স্বামীজীকে কিছু লেখেননি , উপরন্তু সে সম্পর্কে স্বামীজীকে কিছু না জানিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে ওয়েলসে সপরিবারে বেড়াতে চলে গিয়েছিলেন ৷ মিসেস বুলকে স্টার্ডি ৮-ই জুলাই অত্যন্ত নিরাসক্তভাবে এবং অভদ্রভাবে লিখলেন , " আমরা ১০-ই জুলাই ওয়েসলে চলে যাচ্ছি ৷ স্বামীজীর সম্পর্কে আর কোনও খবর জানি না। শুধু জানি মিস নোবেল (নিবেদিতা ) , তুরীয়ানন্দ এবং চক্রবর্তী উপাধিধারী সারদানন্দের এক ভাইকে নিয়ে , যিনি আমার ধারণা একজন 'গৃহস্হ ' ,রওনা হয়েছেন ৷ স্বামীজি কি করতে চান , কোথায় তিনি উঠবেন ইত্যাদি আবিষ্কার করার দায়িত্ব সময়ের উপরই ছেড়ে দিচ্ছি | অর্থাৎ স্টার্ডি যে আর স্বামীজীর কাজে কোনো সহযোগিতা করবেন না তা মিসেস বুলকে জানিয়ে দিলেন I কিন্তু স্বামীজীকে সরাসরি তা জানানোর সাহস তখনও তিনি করে উঠতে পারেননি ৷ তাই তাঁকে ওয়েলসে পালিয়ে যেতে হল ৷ স্টার্ডি তো নিবেদিতা এবং ম্যাকলাউডের চিঠিতে জেনেছেন যে , স্বামীজি সরাসরি লন্ডনেই আসছেন ৷ অতঃপর তা সত্ত্বেও তিনি ওই চিঠিতে লিখলেন ' যদি তারা সরাসরি লন্ডনে আসেন তাহলে ২৭ জুলাই তাদের পৌঁছবার কথা , সে সময়টা এখানে সবচেয়ে বাজে সময় যখন সবাই শহরের বাইরে এবং সমুদ্রের দিকে চলে যাবে ৷ ' এত নিরাসক্তির পর একই পত্রে আবার স্বামীজীর সম্পর্কে কিছুটা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন স্টার্ডি। লিখলেন ,(গত ফেব্রুয়ারি -মার্চে) আপনার এবং মিস ম্যাকলাউডের এখানে আসার ব্যাপারটি আমাদের সকলের অন্তরেই আনন্দদায়ক স্মৃতি হয়ে রয়েছে I ভাবতে ভালো লাগে সেই সব ঘটনা ও সূত্রের কথা যা আমাদের গোল টেবিলে ঘুরে ফিরে এসে আমাদের সবাইকে আত্মিক দিক দিয়ে কাছে নিয়ে আসত যেগুলির কেন্দ্রমনি ছিলেন স্বামীজিই ।
অধ্যাপক রাইট একসময় স্টার্ডির সম্পর্কে তাঁর স্ত্রীকে লিখেছিলেন 'লোকটির চরিত্র বটে ' ৷ বাস্তবিক স্টার্ডি এক বিচিত্র চরিত্র । স্টার্ডি জানতেন , মিসেস বুল নামক ঐ মহিলাটি প্রচুর ধনী এবং স্বামীজী সম্পর্কে অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। স্টার্ভি হয়তো ভাবছিলেন , তাঁর নিজের স্বার্থে স্বামীজীর সঙ্গে বিচ্ছেদ প্রয়োজনীয় হলেও ওই ধনী মহিলাকে চটানো বুদ্ধিমানের কাজ হবে না , তাই স্বামীজী সম্পর্কে শেষে একটু আবেগ প্রকাশ করে তাঁকে খুশি করতে চাইলেন । .
==================
(7)সপ্তম পর্ব।★★★★★
"ক্রশবিদ্ধ বিবেকানন্দ।"
স্বামী পূর্নাত্মানন্দ ।
স্টার্ডি যে ওয়েলসে চলে যাচ্ছেন এ কথা তিনি স্বামীজীকে সম্ভবত জানাননি ,হয়তো বা জানানোর সাহস সঞ্চয় করতে পারেননি। তবে নিবেদিতাকে তিনি তা জানিয়েছিলেন। একথা নিবেদিতার ২১ জুলাই জাহাজ থেকে ম্যাকলাউডকে লেখা চিঠিতে পাওয়া যায়। বলা বাহুল্য , খবরটি পেয়ে নিবেদিতা খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন এবং স্বামীজি ও তুরীয়ানন্দজী কোথায় তাহলে উঠবেন , প্রভৃতি চিন্তা তাঁকে পীড়িত করেছিল । যখন দেখলেন স্টার্ডি শুধু যে উপস্থিত নেই তা নয় , তাঁদের বাসস্থান প্রভৃতির কোনও ব্যবস্থাও তিনি করে রাখেন নি , তখন লন্ডনের সেই 'বাজে' সময় স্বামী তুরীয়ানন্দকে নিয়ে স্বামীজি যে কিরকম বিব্রত বোধ করেছিলেন তা অনুমান করা যায়। অবশ্য নিবেদিতার পরিবারের চেষ্টায় উহম্বলডনে একটি হোটেলে স্বামীজিদের থাকার ব্যবস্থা হল। স্টার্ডির দায়িত্বহীনতায় স্বামীজি যে বিশেষ আহত হয়েছিলেন তা বলা বাহুল্য ৷
স্বামীজি ইংল্যান্ডে পক্ষকাল থেকে ১৬_ই আগস্ট আমেরিকা চলে যান। এই সময়ে স্টার্ডি অবশ্য ওয়েলস থেকে এসেছিলেন স্বামীজীর সঙ্গে দেখা করতে | স্বামীর সঙ্গে সামনাসামনি তিনি ভালো ব্যবহারই করেছিলেন ,যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব ৷ অথচ স্বামীজী লন্ডনে আসার ঠিক আগেই স্টার্ডি মিসেস বুলকে আরও একটা চিঠি দিয়েছিলেন। তাতে তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে , স্বামীজীকে মিসেস বুল , মিস মুলার ,স্টার্ডি প্রমুখ কাজের জন্য যে অর্থ দিয়েছিলেন স্বামীজি তা যথেচ্ছভাবে খরচ করেছেন। স্বামীজী লন্ডনে আসার দু-একদিনের মধ্যে মিসেস বুলের যে চিঠি পান তাতে মিসেস বুল স্টার্ডির ওই অভিযোগের কথা স্বামীজীকে জানিয়েছিলেন । স্টার্ডির উদ্দেশ্য এখানে স্পষ্টতই মিসেস বুলকে স্বামীজীর বিরুদ্ধে উত্তেজিত করা ৷ উইম্বলডন থেকে ৬-ইআগস্ট স্বামীজী মিসেস বুলকে যে উত্তর দেন তাতে লেখেন ,স্টার্ডির ঠিকানায় পাঠানো আপনার পত্র পেলাম। আপনার সহৃদয় কথাগুলোর জন্য আপনার কাছে খুবই কৃতজ্ঞ। ইউরোপ এবং আমেরিকায় কেবল বক্তৃতা করে যে টাকা পেয়েছি তা আমি আমার ইচ্ছা মতো খরচ করেছি কিন্তু কাজের জন্য যা পেয়েছি তার প্রতিটি পাই-এর হিসাব রাখা হয়েছে ও তা মঠে আছে এবং সমস্ত ব্যাপারটা দিবালোকের মতোই পরিষ্কার থাকা উচিত ৷ "
১০-ই আগস্ট স্বামীজী মঠে স্বামী ব্রহ্মানন্দকে লিখলেন ," মিসেস বুলকে একটা হিসাব পাঠিয়ে দিও .কত টাকা জমি কিনতে , কত টাকা বাড়ি করা বা মেরামতিতে , কত টাকা অন্যান্য আনুষঙ্গিক খাতে , ইত্যাদি । হিসাবপত্রে যাতে কোনওক্রমে ভুল না থাকে সেজন্য ব্রহ্মনন্দ মহারাজকে সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ দিলেন ওই একই পত্রে। স্বামীজীর নির্দেশ অনুসারে স্বামী ব্রহ্মানন্দ সমস্ত হিসাব আমেরিকায় স্বামীজির কাছে পাঠিয়ে দেন । হিসাব পেয়ে স্বামীজী ২১ নভেম্বর স্বামী ব্রহ্মানন্দকে লেখেন " হিসাব ঠিক আছে , আমি সেসব মিসেস বুলের হাতে সঁপে দিয়েছি এবং তিনি বিভিন্ন দাতাকে হিসাবের (সংশ্লিষ্ট ) বিভিন্ন অংশ জানানোর ভার নিয়েছেন। ' অবশ্য স্বামীজির উইম্বলডন থেকে লেখা চিঠি পেয়েই মিসেস বুল নিশ্চয়ই স্টার্ভিকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে , স্টার্ডির ধারণা ঠিক নয়। যাইহোক , ইতিমধ্যে স্বামীজি ইংল্যান্ড থেকে আমেরিকায় চলে এসেছেন। এবং স্বামীজি ইংল্যান্ড থেকে আমেরিকায় পৌছানোর পর স্টার্ডি স্বামীজির কাছে সরাসরি মুখ খুললেন ৷
স্বামীজি উইম্বলদন ছাড়ার পরই নিবেদিতার সঙ্গে স্টার্ডির কিছু তথ্য বিনিময় হয় তাতে স্টার্ডির বক্তব্য ছিল স্বামীজী এবং তার গুরুভাইদের মধ্যে সন্ন্যাসী সুলভ কোনও কৃচ্ছ্রতা ও বৈরাগ্যের বিন্দুমাত্রও তিনি দেখেন নি এবং স্টার্ডি সহ ইংল্যান্ডের বন্ধুরা যে টাকা স্বামীজীকে দিয়েছিলেন স্বামীজী সে টাকা যথাযথভাবে খরচ করেন নি। নিবেদিতা তার উত্তরে স্টার্ডিকে বোঝানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করেন যে, স্টার্ডির সমস্ত ধারণা ভুল এবং তাঁকে ভুল বোঝানো হয়েছে। স্টার্ডি তখন স্বামীজীর সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের জন্য ব্যস্ত।সুতরাং নিবেদিতা সমস্ত যুক্তি ও ব্যাখ্যা কে তিনি অন্ধ ও অর্থহীন আবেগ বলে উড়িয়ে দিলেন। " স্টাডির সঙ্গে এই পর্বে যেসব পত্রবিনিময় হয়েছিল নিবেদিতা সেগুলো ম্যাকলাউড এবং মিসেস বুলকে পাঠিয়ে দিলেন । স্বামীজি তখন আমেরিকায় মিসেস লেগেটদের পল্লি-আবাস রিজলি ম্যানর-এ। ম্যাকলাউড পত্রগুলো স্বামীজীকে দেখতে দিলেন। ১৪-ই সেপ্টেম্বর স্বামীজী স্টার্ডিকে একটি চিঠি দিলেন ,এবং তাতে লিখলেন তোমার এবং মিস নোবেল এর মধ্যে যে পত্রবিনিময় হয়েছে তার কিছু আমাকে সেদিন দেখতে দেওয়া হয়েছিল আমি দুঃখিত যে আমরা তোমার আদর্শ যোগ্য হতে পারিনি ৷আমি যখন প্রথমবার আমেরিকায় আসি , তখন ট্রাউজার না পরলে লোকে আমার প্রতি দুর্ব্যবহার করত , তারপর আমাকে কাফ এবং কলার করতে বাধ্য করা হল ,তা না হলে তারা আমাকে ছুঁতোই না , ইত্যাদি , ইত্যাদি ৷তারা আমাকে যা খেতে দিত তা না খেলে আমাকে একটা আজব জীব মনে করত ৷এমনি আরও কত কি সব ৷ এরপর তাঁকে কাজের জন্য যে অর্থ দেওয়া হয়েছিল স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে স্বামীজি তারও পূর্ণাঙ্গ হিসাব দিলেন স্টার্ডিকে এবং লিখলেন ,আমি শুনেছি তোমরা আমাকে যে -টাকা দিয়েছিলি সে সম্পর্কেও কথা উঠেছে ৷ মিস সুটারের কাছ থেকে আমি 500 পাউন্ড=7500 টাকা + 500 পাউন্ড = 7500 টাকা পেয়েছি l গুডউইনের মাধ্যমে মিস মূলার দিয়েছিল 30,000 টাকা | সর্বমোট 45,000 টাকা ৷ (এছাড়া) মিস মুলার আমাদের মঠে একখণ্ড জমি কিনতে সাহায্য করেছেন যার দাম পড়েছে 40,000 টাকা |নৌকা মেরামতের জন্য ব্যবহৃত হতো বলে জমিটির ছিল অসমতল এবং ওখানে ছিল বড় বড় গর্ত ভরাট করার জন্য লেগেছে 4,000 টাকা |জমিটির উপরে আমাদের একটি বাড়ি আছে ... বড় কিছু নয় , আর আছে উপাসনা কক্ষ, লাইব্রেরী ইত্যাদি ৷ এসবের খরচ যুগিয়েছেন আমাদের ভারতীয় বন্ধুরা এবং আমেরিকার মিসেস বুল ৷ জমি সংগ্রহ এবং বাড়ি ঘর নির্মাণ প্রভৃতিতে যে টাকা খরচ হয়েছে তা ইংরেজ বন্ধুদের দেওয়া টাকার চেয়ে বেশি। হাওড়া জেলার রেজিস্ট্রারের কাগজপত্র দেখলেই আমার বক্তব্যের সত্যতা জানা যাবে ৷ কাজের জন্য আমাকে যেখান থেকে যা টাকা দেওয়া হয়েছে তার একটা পাই - ও নিজের জন্য খরচ করিনি ৷ আমেরিকায় আমার ব্যক্তিগত খরচাপাতির টাকা আমার বক্তৃতা অথবা পত্রিকায় লেখা থেকে সংগ্রহ করেছি ৷ মিসেস সেভিয়ার এবং খেতরির রাজা কিছু কিছু অর্থ দিতেন যাতে ভারতে আমার নিজের খরচ চলে যেত ৷ ইংরেজ বন্ধুগণআমাকে যে টাকা দিয়েছেন তার প্রত্যেকটি পাই-এর হিসাব রাখা আছে ৷ যখনই প্রয়োজন মনে করবে , তখনই তোমাকে তা পাঠিয়ে দেওয়া হবে , আমাকে কাশ্মীরের মহারাজার দেওয়া টাকা , মাদ্রাজে প্রকাশিত আমার বইয়ের টাকা এবং বেশিরভাগটা তার নিজেরই টাকা থেকে মিস নোবেল স্কুল আরম্ভ করেছিল ৷
তোমাকে কি কখনো আমাকে টাকা দেওয়ার জন্য আমি লিখেছি ? কোথাও কারও কাছে অর্থ সাহায্য চেয়েছে বলে তো আমার মনে পড়ে না ( এই কারো কাছে বিরল ব্যতিক্রম শুধু শিষ্য হরিপদ মিত্র এবং ক্ষেতরির রাজা অজিত সিংহ , যাদের কাছে স্বামীজি নিজের প্রয়োজনের কথা প্রকাশ করতে সঙ্কোচ বোধ করতেন না ) স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কেউ আমাকে (অর্থ )সাহায্য করলে আমি তা নিয়েছি , যখন তা আমার নিজের প্রয়োজনে খরচ করার জন্য দেওয়া হয়েছে তা আমি খরচ করেছি , অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অন্যের জন্য, কাজের জন্য অর্থ দিলে তা কাজের জন্যই ব্যয়িত হয়েছে ৷
অবশ্য এ আমার কর্মফল,আর এতে আমি খুশিই ৷ কারণ এতে সেই সময়ের জন্য যন্ত্রণা হলেও এ জীবনের আর এক ধরনের অভিজ্ঞতা যা এ-জীবনে অথবা পরজীবনে কাজে আসবে৷ যদি তোমার অথবা মিস মুলারের অথবা মিস সুটারের আমাকে আমার কাজের জন্য অর্থ সাহায্য দেওয়ার ব্যাপারে অনুশোচনা হয়ে থাকে , তাহলে আমাকে শুধু( কিছুদিন ) সময় দাও,আমি তা পরিশোধ করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করব ৷
আমি সর্বদা জানি এবং সর্বদা প্রচার করে এসেছি , প্রত্যেক আনন্দের পশ্চাতে আছে দুঃখ,চক্রবৃদ্ধি সুদ সমেত না হলেও আসলটা তো আসবেই৷ আমি জগতের কাছে প্রচুর ভালোবাসা পেয়েছি, সুতরাং প্রচুর ঘৃণার জন্য আমাকে প্রস্তুত থাকতে হবে ৷আর এতেই আমি খুশি ,কারণ আমার নিজের জীবনেই আমার এই মতবাদ প্রমাণিত হচ্ছে যে প্রত্যেক চড়াই এর সঙ্গেই থাকে তার অনুরুপ উৎরাই ৷
আমার দিক থেকে আমি আমার স্বভাব ও নীতিতে সব সময় অবিচল থাকি .... একবার যাকে বন্ধু বলে গ্রহণ করেছি সে সব সময়ই আমার বন্ধু এবং ভারতীয় নীতি অনুসারে আমি বাইরের ঘটনাবলীর কারণ আবিষ্কারের জন্য অন্তরেই দৃষ্টিপাত করি ৷ আমি জানি যে , আমার উপর এত বিদ্বেষ ও ঘৃণার তরঙ্গ এসে পড়ে তার জন্য দায়ী আমি এবং শুধু আমিই ৷ এছাড়া অন্য কিছু হতে হতে পারে না ৷ তুমি এবং মিসেস জনসন যে আরেকবার আমাকে অন্তমুখী হবার জন্য অবহিত করেছ , সে জন্য তোমাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি ৷ "
সতত স্নেহবদ্ধ এবং শুভাকাঙ্খী ,
বিবেকানন্দ ৷
===================
(8)অষ্টম পর্ব।★★★★★★★
"ক্রশবিদ্ধ বিবেকানন্দ।"
--------স্বামী পূর্নাত্মানন্দ
এই ধারাবাহিকটিতে আমরা লক্ষ্য করে এসেছি প্রিয় শিষ্য স্টার্ডি এতদিন .স্বামীজীকে সরাসরি কিছু বলতে পারেননি । তবে বলার কথা ভাবছিলেন, কিন্তু সাহসে কুলাচ্ছিল না I নিবেদিতাকে স্টার্ডি লিখলেন, " আমি রোজই ভাবছি কিভাবে আমি স্বামীজীর সম্পর্কে আমার আশাভঙ্গের কথা তাঁর গোচরে আনি ! ' অবশেষে আমরা দেখতে পেলাম ,নিবেদিতার পাঠানো চিঠি পত্র ম্যাকলাউড স্বামীজীর হাতে তুলে দেওয়ায় স্বামীজি নিজে থেকেই স্টার্ডিকে তার সমস্ত অভিযোগের সুনির্দিষ্ট উত্তর দিলেন , কিন্তু স্বামীজি তার চিঠিতে স্টার্ডিকে দোষারোপ না করে মহান ঔদার্যের সঙ্গে লিখলেন ,এই দুর্নাম তাঁরই ললাটলিপি | স্টার্ডি স্বামীজির ওই চিঠির জন্য প্রস্তুত ছিলেন না ৷ স্টার্ডি দেখলেন, তার সমস্ত অভিযোগের উত্তর স্বামীজি দিয়েছেন ,তখন স্টার্ডি একটু মুশকিলেই পড়লেন ৷ কিন্তু তখন তিনি কোমর বেঁধে ঝগড়া করার জন্য বদ্ধপরিকর৷ তার ১- অক্টোবরের চিঠিতে স্টার্ডি বললেন, স্বামীজি নিজে প্রচার করছেন বৈরাগ্য ও কৃচ্ছ্রতার কথা কিন্তু তিনি নিজে এবং লন্ডনে তার গুরু ভাইরা (স্বামী সারদানন্দ এবং স্বামী অভেদানন্দ ) যাপন করছেন চরম বিলাসীর জীবন ৷এককথায় স্টার্ডি বললেন , স্বামীজি এবং গুরু ভাইরা যথার্থ সন্ন্যাসী নন ,সন্ন্যাসের ভেকধারী ৷ স্বামীজি উত্তর দিলেন ৷ স্টার্ডির স্পর্ধায় তিনি আহত ও বিস্মিত হয়েছিলেন নিশ্চয়ই ৷
স্বামীজি বুঝলেন যে , স্টার্ডি আসলে তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের যবনিকা টানতে চাইছেন৷ সম্পর্ক যখন শেষ করবেনই স্টার্ডি , তখন তা যতটা শান্তিপূর্ণভাবে করা যায় তার চেষ্টা করলেন স্বামীজি | স্টার্ডি ভুল করছেন ,স্টার্ডি উন্মাদ হয়েছেন , কিন্তু স্বামীজি তাঁর স্বভাবজাত মহিমা ও ক্ষমাকে তো বিসর্জন দিতে পারেন না ৷ তিনি যে একসময় স্টার্ডিকে স্থান দিয়েছিলেন তার প্রশস্ত উদার বক্ষে ৷ তাই স্টার্ডির আক্রমণকে উপেক্ষা করে এবং আর তিক্ততা বৃদ্ধি না করে ওই প্রসঙ্গ শেষ করতে চাইলেন স্বামীজি ৷ ভাবলেন , এতে স্টার্ডি শান্ত হবেন ৷পরম ক্ষমায় স্বামীজি স্টার্ডিকে লিখলেন ( অক্টোবর ১৮৯৯ ) হয়তো তোমারসমালোচনার অনেকখানি অংশ সঙ্গত ও সত্য ৷ আবার এও সম্ভব , একদিন তুমি দেখবে এ-সকলই কারো কারো সম্পর্কে (নিবেদিতা প্রভৃতি) তোমার বিরাগ থেকে সৃষ্টি হয়েছে , আর আমি হয়েছি তার শিকার ৷
যাইহোক এসব নিয়ে তিক্ততার প্রয়োজন নেই , যেহেতু আমি যা নই তার ভান কখনো করেছি বলে মনে পড়ে না, আর তা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, কারণ আমার ধূমপান , বদমেজাজ ইত্যাদি , আমার সঙ্গে যে- কেউ ঘন্টাখানেক কাটালেই জানতে পারবে ৷ মিলন - মাত্রেরই বিচ্ছেদ আছে। 'এই হল প্রকৃতির নিয়ম। আশাভঙ্গের কোন মনোভাব আমি বয়ে বেড়াই না ৷কর্মই আমাদের মিলিয়ে দেয় , আবার কর্মই বিচ্ছিন্ন করে ৷
হিসাব কেন পাঠানো হয়নি তার উত্তরে স্বামীজি লিখলেন ' হিসাবপত্র আগে পাঠানো হয়নি তার কারণ কাজ তো এখনও শেষ হয়নি । সমস্ত ব্যাপারটা হয়ে গেলে তা দাতার তার কাছে সম্পুর্ন হিসাব পেশ করব , ভেবেছিলাম ৷ টাকার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার ফলে কাজ মাত্র গত বছর শুরু হতে পেরেছে ৷ ' স্বামীজীর জন্য স্টার্ডিকে মানসিক অশান্তি ও যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে বলে স্বামীজি নিজেকেই দোষী বললেন ,আর সবশেষে আশীর্বাদ করলেন শিষ্যকে যেমন করতেন আগে , না ,তার চেয়েও বেশি : ' সমস্ত আশীর্বাদ তোমাকে এবং তোমাদের সকলকে চিরকাল ঘিরে থাকুক , এই বিবেকানন্দের নিরন্তর প্রার্থনা ৷ "
বিবেকানন্দ শিষ্যের প্রগলভতাকে হজম করতে চেয়েছিলেন। যদিও শিষ্যের বিশ্বাসঘাতকতার সেই আঘাত তাঁর হৃদয়কে রক্তাক্ত করেছিল ৷ কিন্তু স্বামীজীর সেই উদার ক্ষমাকে স্টার্ডি কোনও মূল্য না দিয়ে , আরও আক্রোশ নিয়ে , আরো অপমানকর ভাষায় , স্বামীজীকে পুনরায় আক্রমণ করলেন
( ৩- নভেম্বর ১৮৯৯ ) স্বামীজী দেখলেন স্টার্ডির আচরন মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে ৷ যদি স্বামীজী তাঁকে আর প্রশ্রয় দেন তাহলে অসত্যর সঙ্গে আপস করা হবে ৷ কারণ মরিয়া হয়ে স্টার্ডি এবার যেসব অভিযোগ এনেছিল সেগুলো তো আর উদ্ভট , কল্পনা প্রসূত ৷ স্টার্ডি লিখলেন ইংল্যান্ডে স্বামীজীর কাজ যে নষ্ট হয়ে গেছে তার জন্য দায়ী স্বামীজীর নিজের আচরণ। স্টার্ডির ব্যাখ্যায় স্বামীজীর ধূমপান , বিলাসিতা প্রভৃতি। নিজের ব্যর্থতা এবং অপদার্থতার গ্লানি গোপন করে স্বামীজীর উপরে তা চাপিয়ে দিয়ে স্টার্ডি নিজেকে নির্লজ্জভাবে দায়মুক্ত করতে চাইছিলেন ৷ স্টার্ডি লিখলেন যে , স্বামীজী লন্ডনে থাকতে তাঁর এবং তাঁর গুরুভাইদের বিলাসিতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা হত ,এমনকি সমালোচনা এসেছে স্বামীজীর বিশিষ্ট বন্ধুদের কাছ থেকেও ৷ এবং সমালোচকদের কাছে স্বামীজীর আচরণের পক্ষে ওকালতি করার জন্য স্টার্ডিকে তখন সর্বদাই অনেক মিথ্যা সাফাই গাইতে হত । স্টার্ডির এই অভিযোগগুলি নির্ভেজাল মিথ্যা , কারণ স্বামীজি লন্ডনে যখন ছিলেন তখন স্টার্ডি যা বলেছিলেন তা আমরা আগে দেখেছি ৷ 'বিলাসী ' বিবেকানন্দ যখন দ্বিতীয়বার ইংল্যান্ডে আছেন তখন একটি চিঠিতে ইংল্যান্ড স্বামীজীকে কিভাবে গ্রহন করেছিল সে সম্পর্কে স্টার্ডি লিখেছিলেন (২২ -অক্টোবর ১৮৯৬) ... " এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে ,স্বামী বিবেকানন্দের মতো বেদান্ত প্রবক্তার . প্রভাব যদি বজায় রাখা এবং বিস্তারিত করা যায় , তাহলে তা পাশ্চাত্য জগতের চিন্তা ধারাকে বহুলাংশে নিয়ন্ত্রিত করবে ,সম্পদ এবং বিলাসের প্রতি দারুন লালসায় আত্মবিস্মৃত তাদের মনের গতি পরিবর্তনে সহায়তা করবে ৷ আর ইংল্যান্ড থেকে স্বামীজীর ভারতে ফেরার প্রাক্কালে ১৩ ডিসেম্বর ১৮৯৬ লন্ডনে স্বামীজীকে যে বিরাট বিদায় সম্বর্ধনা দেওয়া হয়েছিল (সেসভায় স্টার্ডি ছিলেন সভাপতি ) তার বর্ণনা দিয়ে তিনদিন পর ১৬-ই ডিসেম্বর স্টার্ডি তাঁর এক আমেরিকান বন্ধুকে লেখেন " তোমার ধারনা ঠিকই ৷ আমার জীবনের মহওম বন্ধু ও পবিত্রতম শিক্ষককে বিদায় দিয়ে আজ আমার হৃদয় ভারাক্রান্ত ৷ আমি নিশ্চয়ই গত জীবনে অসাধারণ কোনও শুভকর্ম করেছি যার জন্য এমন পূন্য-সৌভাগ্য লাভ করেছি ৷ আমি সারাজীবন ধরে যা চেয়েছি সে সমস্তরই পরিপূর্তি দেখেছি স্বামীজীর মধ্যে এবং স্বামীজী যখন লন্ডন থেকে সত্যিই বিদায় নিচ্ছেন ( ১৬ ডিসেম্বর ১৮৯৬ )তখন কি করেছিলেন স্টার্ডি ? স্টার্ডি সরলভাবে নিঃসংকোচে মিস ম্যাকলাউডকে লিখেছিলেন " আমি স্বামীজীর বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিলাম ৷ "
স্টাডি স্বামীজীকে লিখেছিলেন তার গুরুভাইদেরও বিলাসিতার কথা ৷ অথচ 16 ডিসেম্বর 1896 স্বামীজীর গুরুভাই স্বামী অভেদানন্দ সম্বন্ধে স্টার্ডি কি লিখেছিলেন তা আর একবার আসুন আমরা স্মরণ করি ৷স্টার্ডি লিখেছিলেন তাঁর (স্বামীজীর )কাজ নিয়ে সরাসরি এগিয়ে চলেছি ৷ তাঁর গুরুভাই ও তার( স্বামী অভেদানন্দ যিনি ইতিমধ্যেই স্বামীজীর কাজের ভার নেওয়ারজন্য স্বামীজীর আহ্বানে ইংলান্ডে এসেছেন এবং স্টার্ডির বাড়িতেই তাঁর অতির্থি হয়ে রয়েছেন ) অতি চমৎকার , আকর্ষক এবং তপস্যাপ্রবন বৈরাগ্যবান যুবক , তিনি এ ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করবেন ৷ ' .
=====================
(9)নবম পর্ব।★★★★★★★
"ক্রশবিদ্ধ বিবেকানন্দ।"
স্বামী পূর্নাত্মানন্দ ।
প্রত্যক্ষদর্শী মহেন্দ্র নাথ দত্তের "লন্ডনে স্বামী বিবেকানন্দ" গ্রন্থ থেকে জানতে পারা যায় , স্বামীজীর আর এক গুরু ভাই স্বামী সারদানন্দকে ইংল্যান্ডে মিস মুলারের বাড়িতে কত কষ্টে থাকতে হয়েছে এবং কত সাধারন খাবার তাঁর ভাগ্যে সেখানে জুটেছে ৷ শুধু তারই নয় , স্বামীজীরও ,অথচ স্টার্ডি বেমালুম মিথ্যা অভিযোগ করে চলেছেন স্বামীজীদের বিলাসিতা নিয়ে ৷ স্বামীজীকে তাই তুলে ধরতে হলো প্রকৃত চিত্রটি। স্বামীজি লিখলেন ( নভেম্বর ১৮৯৯ ) :,
' প্রিয় স্টার্ডি ,
আমার আচরণ সমর্থনের জন্য এই চিঠি নয় । যদি আমি অন্যায় কিছু করে থাকি , কথা দিয়ে তাকে মোছা যাবে না , আর যদি কোনও সৎকাজ করে থাকি , কোনও বিরূপ সমালোচনা বা নিন্দা করে আমাকে তা থেকে বিরত করাও যাবে না ৷
বিলাসিতা ! গত কয়েক মাস ধরে কথাটা বড় বেশি শুনতে পাচ্ছি , পাশ্চাত্য বাসিরা নাকি তার উপকরণ যুগিয়েছে ! আর সর্বক্ষণ বৈরাগ্যের মহিমা কীর্তন করে ভন্ড আমি নিজে নাকি সেই বিলাসিতা ভোগ করে আসছি ৷ .আশাকরি প্রয়োজন মনে করলে এই চিঠি ( ইংল্যান্ডে আমার সমালোচক এবং আমার প্রতি সহানুভূতিশীল সকল ) বন্ধুদের কাছে একে একে পাঠিয়ে দিও এবং কোথাও যদি আমি ভুল লিখে থাকি সংশোধন করে দিও ৷
রডিং -এ তোমার বাড়ির কথা মনে পড়ে ,যেখানে দিনে তিনবার আমাকে খেতে দেওয়া হতো,বাঁধাকপি সেদ্ধ আলু সেদ্ধ , ভাত আর মসুর ডাল- সেদ্ধ ৷ আর একটু আচার দেওয়ার জন্য (শুনতে হতো ) তোমার স্ত্রীর অবিরাম অভিশাপ। বেশি কি কম দামের , কোন প্রকার সিগার ধূমপানের জন্য কখনও আমাকে (কিনে ) দিয়েছো বলে মনে পড়ে না .এবং (ওই ধরনের) খাবার এবং তোমার স্ত্রীর দিনরাত অভিশাপ সম্পর্কে আমি কখনো ( তোমার বা অন্য কারো কাছে ) অভিযোগ করেছি বলে মনেও পড়ে না ,যদিও আমি বাস্তবিক চোরের মত থাকতাম আর সব সময় ভয়ে কাঁপতাম (পাছে তোমার স্ত্রীর অথবা তোমার কোনও বাড়তি অসুবিধার সৃষ্টি করে ফেলি )কিন্তু খেটে যেতাম তোমাদের (কল্যাণের ) জন্যই।
দ্বিতীয় স্মৃতি সেন্ড জর্জেস রোডের বাড়ি ,যেখানে ছিলাম তোমার এবং মিস মুলারের তত্ত্বাবধানে ৷ আমার হতভাগ্য ভাই (মহেন্দ্রনাথ ) অসুস্থ হয়ে পড়ল আর মিস মুলার তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলেন ৷ওখানেও মনে করতে পারছিনা কোন্ বিলাসের মধ্যে ছিলাম ,আহার ,পানীয় ,শয্যা কিংবা যে ঘরে আমাকে থাকতে দেওয়া হয়েছিল,তার দিক দিয়েও ৷
পরবর্তী স্মৃতি মিস মুলারের বাড়ির ৷ তিনি অবশ্যই দয়াবতী , কিন্তু আমাকে বাদাম ও ফল খেয়ে জীবন ধারণ করতে হয়েছিল | তারপরের স্মৃতি লন্ডনের একটি অন্ধকূপের ( ১৪ গ্রে কোর্ট গার্ডেন্স ) যেখানে দিনরাত আমাকে খাটতে হয়েছে , কাজের ফাঁকে 5 -6 জনের জন্য রান্না করতে হয়েছে এবং অধিকাংশ রাত কাটাতে হয়েছে দু-এক কামড় রুটি মাখন খেয়ে ৷
ক্যাপ্টেন ও মিসেস সেভিয়ার কে বাদ দিলে ইংল্যান্ডে রুমাল মাপের একটুকরো কাপড়ও কেউ আমাকে দিয়েছে বলে মনে পড়ে না ৷ অথচ অপরপক্ষে ইংল্যান্ডে আমার শরীর ও মনের উপর যে প্রচণ্ড চাপ পড়েছিল , তাতে আমার স্বাস্থ্য ভেঙ্গে যায় ৷ তোমরা ,ইংরেজরা আমাকে এই তো দিয়েছো আর মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছো খাটিয়ে খাটিয়ে ,আর এখন আমাকে দিচ্ছ বিলাসিতার অপবাদ !! তোমাদের মধ্যে কেউ আমাকে একটা কোট দিয়েছ , বলতে পার ? কেউ একটা সিগার ? এক টুকরো মাছ বা মাংস? তোমাদের মধ্যে একথা কার বলবার সাহস আছে যে ,তোমাদের কাছে আমি খাবার ,পানীয় সিগার ,পোশাক অথবা টাকাকড়ি চেয়েছি ? জিজ্ঞাসা করো স্টার্ডি , ঈশ্বরের দোহাই , জিজ্ঞাসা করো সেকথা জিজ্ঞাসা করো তোমার বন্ধুদের এবং সর্বপ্রথম জিজ্ঞাসা করো তোমার অন্তর্যামী ঈশ্বরকে যিনি কখনো ঘুমান না ৷
আমার কাজের জন্য তোমরা যে টাকা দিয়েছো তার প্রত্যেকটি পাই (শুধু কাজের জন্যই) রাখা ( অথবা কাজের জন্যই খরচ করা ) হয়েছে ৷ তোমাদের চোখের সামনে আমি আমার (অসুস্থ) ভাইকে অন্যত্র সরিয়ে দিয়েছিলাম ,মৃত্যুর দিকেই বোধ হয় ; কিন্তু যা আমার ব্যক্তিগত টাকা নয় , তার থেকে একটা পয়সাও (তাকে ) দিইনি I আর অন্যদিকে ক্যাপ্টেন ও মিসেস সেভিয়ায়ের কথা মনে পড়ে , শীতের সময় তাঁরা আমাকে পোশাক দিয়েছেন , অসুস্থ হলে নিজের মায়ের থেকেও স্নেহে যত্নে আমার সেবা করেছেন , ক্লান্তি ও দুঃখের দিনে আমার সমব্যথী হয়েছেন I এবং তাঁদের কাছ থেকে কিন্তু আমি শুধু আশীর্বাদই পেয়েছি ৷ তাঁরা কখনো আমাকে বিলাসিতার জন্য নিন্দা করেননি , যদিও আমার ইচ্ছা ও প্রয়োজন হলে বিলাসিতার উপকরণ জোগাতেও তাঁরা সব সময় প্রস্তুত ছিলেন ৷
মিসেস বুল , মিস ম্যাকলাউড , মিস্টার ও মিসেস লেগেট সম্বন্ধে তোমাকে বলা নিষ্প্রয়োজন I মিসেস বুল ও মিস ম্যাকলাউড আমাদের দেশে গিয়েছেন এবং জীবনের সাধারণ সুখ সুবিধাগুলি ত্যাগ করে আমাদের মধ্যে এমন ভাবে বসবাস ও চলাফেরা করেছেন , যা কোনও বিদেশী কখনো করেনি এবং তাঁরা আমার বা আমার বিলাসিতা নিয়ে সমালোচনা করেননি। আমাকে ভাল খাওয়াতে পারলে অথবা আমি চাইলে দামী সিগার খাইয়ে তাঁদের আনন্দের সীমা থাকে না I আর আমি যখন তোমাদের দেশের মানুষদের জন্য প্রাণপাত করছিলাম , যখন তোমরা নোংরা গর্তে অনাহারের মধ্যে রেখে আমার গায়ের মাংস কেটে কেটে তুলে নিচ্ছিলে এবং সঞ্চয় করে রাখছিলে আমার জন্য বিলাসিতার এই অপবাদ , তখন ওই লেগেট ও বুলদের দেওয়া রুটিই আমি খেয়েছি , তাঁদের দেওয়া পোশাকেই গা দেখেছি , তাঁদের টাকাতেই ধূমপান করেছি এবং কয়েকবার আমার বাড়ি ভাড়ার টাকা তাঁরাই মিটিয়েছেন ৷
দেখো স্টার্ডি , যাঁরা সত্যিই আমাকে সাহায্য করেছেন বা এখনো করে চলেছেন , তাঁদের কাছ থেকে কিন্তু কোনও সমালোচনা বা নিন্দা আসেনি , আজও আসছে না I যারা কিছুই করে না , বরং শুধু নিজের স্বার্থসিদ্ধির পথ খোঁজে , তারাই কেবল নিন্দা ও সমালোচনা বর্ষণ করে I ... ঈশ্বরকে ধন্যবাদ , আগেই হোক বা পরেই হোক , তাদের স্বরূপ বেরিয়ে পড়েছে । আর এইসব হৃদয়হীন , স্বার্থসর্বস্ব লোকের অভিপ্রায় অনুসারে তুমি আমার আচরণ , আমার কর্ম ধারা পরিবর্তন করতে উপদেশ দিচ্ছো , আর যেহেতু আমি তা করছি না , তাই তুমি রাগে উন্মাদ হয়ে গেছো !!
আর একটা কথা ,( তুমি বলেছ , ভন্ড আমি নাকি সর্বক্ষণ কঠোরতা ও বৈরাগ্যের মহিমা কীর্তন করে নিজে বিলাসিতা ভোগ করছি , তার উত্তরে বলি ) যদি তুমি দেখাতে পারো। কোথাও আমি দেহের উপর নির্যাতনের কথা প্রচার করেছি , তাহলে খুব খুশি হব । শাস্ত্রের কথা তুললে আমি বলি , সন্নাসী এবং পরমহংসদেবের জীবন যাপনের যে নিয়মবিধি হিন্দু শাস্ত্রে লিপিবদ্ধ আছে , তা আমরা পালন করি নি , এই অভিযোগের সত্যতা যদি কোনও শাস্ত্রজ্ঞানী পন্ডিত আমাদের দেখিয়ে দিতে পারেন তাহলে সত্যিই আমি খুব খুশি হব ৷
হ্যাঁ স্টার্ডি --- বেদনায় আমার হৃদয় ভারাক্রান্ত হচ্ছে | এর সবই আমি বুঝি | তুমি কোন্ পরিস্থিতিতে পড়েছ আমি বুঝতে পারছি , তুমি এমন কিছু লোকের কবলে পড়েছে যারা ( তাদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য) তোমাকে ব্যবহার করতে চায় ৷ তোমার স্ত্রীর কথা বলছি না ' , সে সরল প্রাণ ,ক্ষতিকর সে কিছু করতে পারে না I কিন্তু বৎস , তুমি মাংসের গন্ধ পেয়েছ। সামান্য কিছু অর্থ। আর শকুনিরা তাই তার চারপাশে ৷ এই হল জীবন ৷
প্রাচীন ভারত ( এবং তার আদর্শ ) সম্পর্কে তুমি অনেক কথা বলেছ | সেই ভারত আজও কারো কারো মধ্যে বেঁচে আছে ,এখনো সে মরেনি ৷ আজও সেই জীবন্ত ভারত ধনীর অনুগ্রহের তোয়াক্কা না রেখে নির্ভয়ে নিজ বানী উচ্চারণ করার ক্ষমতা রাখে ৷ কারো মতামতের পরোয়া সে করে না ৷ না এদেশে ,যেখানে তার চরন শৃংখলাবদ্ধ , কিংবা ওদেশে, যেখানে শৃঙ্খলের প্রান্তভাগ ধরে রয়েছে তার শাসকবর্গ , তাদের মুখের সামনেও না ৷ সেই ভারত এখনো বেঁচে আছে স্টার্ডি ,অমর প্রেমের ভারতবর্ষ , চিরন্তন বিশ্বস্ততার ভারতবর্ষ , যে ভারতবর্ষ অপরিবর্তনীয় , কেবল রীতিনীতিতে নয় ,প্রেমে , বিশ্বাসে ,বন্ধুত্বে ৷সেই ভারতের অতি নগন্য এক সন্তান আমি , তোমাকে ভালোবাসি স্টার্ডি , ভারতীয় প্রেমের ধর্মে ,এবং তোমাকে তোমার ভ্রান্তি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সাহায্য করতে আমি সহস্রবার দেহপাত করতে প্রস্তুত ৷ "
স্টার্ডির ভিত্তিহীন নির্মম সমালোচনা এবং নিন্দা বর্ষণের পরও এই আশীর্বাদ ও ক্ষমতার মন্ত্রোচ্চারণ শুধু বিবেকানন্দের পক্ষেই সম্ভব ৷ এটা ঠিক যে , প্রিয়তম এক শিষ্যের চূড়ান্ত বিশ্বাস হীনতায় গভীর ব্যথায় ভরে গিয়েছিল তাঁর অন্তর ৷ আর সেখান থেকেই ' ঝলসে উঠল উন্মুক্ত তরবারি -ফলার মতন কতগুলো কথা ৷তাতে শোণিতের চিহ্ন ছিল ,হায় ,সে তাঁরই হৃদয়শোনিত ৷ '
বিবেকানন্দের মহিমা শুধু তার বাণীতে নয় তার চরিত্রে তাঁর প্রত্যেক সাধরন আচরনেও ৷ কিন্তু বিবেকানন্দও মানুষ ছিলেন , বিশ্বাসঘাতকতা তাঁরও হৃদয়ে আঘাত করত ৷ তবুও তিনি ছিলেন বিবেকানন্দ , তাই আমরা দেখি স্টার্ডি তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করলেও তিনি স্টার্ডিকে কোনদিনও মন থেকে সরিয়ে দিতে পারেননি। পারেননি মিস মুলারকেও ৷ ৬ ই জানুয়ারি ১৯০১ তারিখে মিসেস ওলি বুলকে স্বামীজী লিখছেন,মিস মুলার এবং স্টার্ডির সঙ্গে যখন আপনার দেখা হবে তখন অনুগ্রহ করে তাদের আমার অফুরন্ত ভালবাসা জানিয়ে দেবেন ৷ "
========================
(10)দশম তথা অন্তিম পর্ব ★★★★
"ক্রশবিদ্ধ বিবেকানন্দ।"
স্বামী পূর্নাত্মানন্দ ।
স্বামীজি স্থূল দেহে থাকতে স্টার্ডির সঙ্গে আরো দু- একবার চিঠিপত্রে যোগাযোগ হয়েছিল ৷একবার ১৯০০ খ্রিস্টাব্দর শরৎকালে , স্বামীজী তখন প্যারিসে ৷ মিসেস স্টার্ডির মৃত্যুসংবাদ স্বামীজির কাছে কোনভাবে এসে পৌঁছলে স্বামীজি স্টার্ডিকে সান্ত্বনা দিয়ে একটি চিঠি দিয়েছিলেন ৷ চিঠিটি হয়তো স্টাডি পাননি ,আরেকটি চিঠি স্বামীজি স্টার্ডিকে লিখেছিলেন ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের ১৫-ইজানুয়ারি ৷এই চিঠি থেকে অনুমান করা যায় যে , স্বামীজীর ওইশেষ দীর্ঘ চিঠিটি ( নভেম্বর ১৮৯৯ ) পেয়ে স্টার্ডি স্বামীজীকে আরও একটি পত্রাঘাত করেছিলেন হয়তো অধিকতর কঠোর ভাষায় ৷ স্বামীজী অবশ্য আর উত্তর দেননি ৷ এই চিঠির শেষে দেখা যায় , স্বামীজি মিসেস জনসনকে শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জানিয়েছেন। সেই মিসেস জনসন যিনি স্টার্ডির সঙ্গে যোগ দিয়ে স্বামীজীর উপর নিন্দাবর্ষন করেছিলেন ৷
১৯০১ খ্রিস্টাব্দের ৪-ই এপ্রিল তারিখে নিবেদিতাকে লেখা স্বামীজীর একটি চিঠি থেকে জানা যায় যে , তিনি স্টার্ডির আরেকটি চিঠি সবেমাত্র পেয়েছেন যাতে লংম্যান্স থেকে স্বামীজীর রাজযোগের পরবর্তী প্রকাশ সম্পর্কে স্টাডি স্বামীজীর মতামত জানতে চেয়েছেন ৷ স্বামীজী স্টার্ডিকে সে বিষয়ে মিসেস বুলের সঙ্গে পরামর্শ করতে বলেছিলেন ৷ সম্ভবত স্টার্ডিকে স্বামীজীর এবং স্বামীজীকে স্টার্ডির সেই শেষ চিঠি ৷
কিন্তু এখানেই সব শেষ হয়নি ৷ এরপর অপেক্ষা করে ছিল আরও একটি অধ্যায় , সেই অধ্যায় স্টার্ডির পরিবর্তনের ৷ স্বামীজীর দেহান্তের ( ৪ জুলাই ১৯০২ ) পরেও স্টার্ডি বহু বছর বেঁচে ছিলেন ৷ সুদীর্ঘকাল পরে ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের 'বেদান্ত কেশরী ' পত্রিকায় ফেব্রুয়ারি- মার্চ সংখ্যায় 'তখন আর এখন " শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন স্টার্ডি ,বোধ হয় ' তখন ' যে অপরাধ করেছিলেন 'এখন ' তার প্রায়শ্চিত করার বাসনাতেই ৷ লক্ষ করার বিষয় যে স্টার্ডি তাঁর তখনকার 'আমি ' -কে দিব্যি 'অপরদের ' মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন ৷ পাশ্চাত্য জীবনের (বিলাসময় ) যে স্বাভাবিক ধারা তাঁর চারদিকে বয়ে যেত তা র্তাঁর ওপর কোনও প্রভাবই বিস্তার করতে পারত না ৷ তিনি তাঁর সহজাত স্বভাবেই অবিচল থাকতেন , যারা তাঁর হৃদয় ও মনের বিশালতা বুঝতে অসমর্থ ছিল , তারা তাঁকে বিলাসী বলে সমালোচনা করত , কিন্তু তিনি কখনওই তা ছিলেন না ৷ দেহ ও মনের উপর ছিল তাঁর চূড়ান্ত প্রশ্নাতীত সংযম ৷ ঠিক এক বছর পরে স্টার্ডি আবার 'বেদান্ত কেশরীতে ' লিখলেনঃ , " স্বামীজীর ব্যক্তিত্বে ছিল চৌম্বকীয় আকর্ষনী শক্তি ,সেই সঙ্গে ছিল সুগভীর ধ্যান- প্রশান্তি ৷ তিনি পথেই হাঁটুন বা ঘরেই দাঁড়িয়ে থাকুন , সর্বত্রই ছিল সেই একই মহিমা ৷ আরও অনেক প্রশস্তি স্টার্ডি সেখানে করেছেন ৷ তার মধ্যে দু-একটি , "সর্বশ্রেণীর মানুষ শিক্ষিত অথবা অশিক্ষিত ,যারাই তার সংস্পর্শে এসেছে , সকলেই এই পুরষ প্রবরের সহজাত মহত্ত্বের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে ,শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেছে ৷সকল সময় অনুভব করা যেত , আধুনিক পরিভাষায় বলতে গেলে , " তিনি ছিলেন ইশ্বরের পরম সান্নিধ্যের বিষয়ে সদা সচেতন ৷ ' . পথে হাঁটছেন , ভ্রমন করছেন ,অবসর যাপন করছেন। অবিরাম তাঁর . ভেতর থেকে আসতো পরমের আহ্বান , ভক্তির নিবেদন ৷ " আবার বলছেন ,'যথার্থ জ্ঞান লাভ করলে আমরা সর্বত্র ঈশ্বর দর্শন করব নিশ্চয়ই ৷ কিন্তু আমাদের পরম সৌভাগ্য ঘটে যখন আমরা সেই দিব্য পরমকে মূর্ত দেখতে পাই মহান ও পূন্য পুরুষদের মধ্যে ৷ স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন তেমনি একজন পুরুষ । '
স্বামীজি স্টার্ডির বিরুপতার ' ঢেউটা ' চলে যাওয়ার ' অপেক্ষায় ' ছিলেন বলেছিলেন ৷ স্থূল শরীরে না হলেও সূক্ষ্ম শরীরে স্বামীজি নিশ্চয় দেখেছিলেন প্রায় দীর্ঘ 40 বছর পরে কীর্তিনাশা স্টার্ডির আত্মসমর্পণের তরঙ্গ আবার ফিরে এসে প্রণাম হয়ে আসছে পড়েছিল তাঁরর পায়ের তলায় ৷
এবার আমাদের এই প্রসঙ্গ শেষ করতে হচ্ছে , কিন্তু স্মরণ করতে হচ্ছে নিজের সম্পর্কে সেই ' অশেষ ' মানুষটির একটি মন্তব্য যা তিনি তাঁর সমালোচকদের কথা মনে রেখেই স্বগতোক্তিতে উচ্চারণ করেছিলেন , " what I am , is written on my brow .If you can read it , you are blessed . If you cannot , the loss is yours , not mine . "
কে আমি তা লেখা আছে আমার ললাটে যদি তোমরা তাঁর পাঠোদ্ধার করতে পারো তাহলে তোমরা ধন্য আর যদি না পারো তাহলে দুর্ভাগ্য তোমাদেরই , আমার তাতে কিছু যায় আসে না ৷
সমাপ্ত ...
সম্পুর্ন লেখাটি ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংগৃহিত।
(আমার হসংগ্রহ)
আদ্যনাথ রায় চৌধুরী।
========================
Comments
Post a Comment