"আত্মারামের কৌটা" স্থাপন’ |
>||★"আত্মারামের কৌটা" স্থাপন’ ||
ঐতিহাসিক ১৪ই জানুয়ারি
১৯৩৮ সালের ১৪ জানুয়ারি, বাংলার ১৩৪৪ সালে ৩০ পৌষ মকর সংক্রান্তির দিন স্থায়ী মঠের স্থায়ী মন্দিরের দ্বারোদ্ঘাটন হল। বেদির সম্মুখে উৎকীর্ণ হংস, তার ওপর প্রস্ফুটিত পদ্ম। ৩০ পৌষ ‘আত্মারামের কৌটা’ স্থাপন করা হল বেদির ওপর।
শ্রীরামকৃষ্ণের মূর্তিগড়ার জন্য ভাস্করের সন্ধান শুরু হল। কিছুতেই মনের মতো ভাস্কর মেলে না। মঠের তরফ থেকে একাধিক ভাস্করকে শ্রীরামকৃষ্ণ মূর্তির মডেল গড়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু কোনটিই পছন্দ হয়নি সন্ন্যাসীদের।
অবশেষে বাগবাজারের পশুপতি বসুর পুত্র কালী বসু মঠের সন্ন্যাসীদের নিয়ে হাজির হলেন গোপেশ্বর পালের কাছে।
গোপেশ্বর পাল ছিলেন সেই যুগের বিখ্যাত ভাস্করশিল্পী। বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেল গোপেশ্বর পালের শিল্পকলায় মুগ্ধ হয়ে ব্রিটিশ এম্পায়ার একজিবিশনে তাঁর নাম প্রস্তাব করেছিলেন। সন্ন্যাসীদের কথোকথনের পর গোপেশ্বর, শ্রীরামকৃষ্ণের সমাধিস্থ হয়ে যাওয়া যে ছবির অনুসরণে তৈরি হবে মূর্তি তার একটি এনলার্জমেন্ট পাঠানোর অনুরোধ করেন।
গোপেশ্বরকে প্রাথমিক পারিশ্রমিক নেওয়ার অনুরোধ করা হলেও তিনি রাজি হননি। শ্রীরামকৃষ্ণের ছবি দেখে মডেল তৈরি হবে। সেই মডেল যদি পছন্দ হয় তখনই মূর্তিগড়ার পাকা কথা হবে বলে জানান তিনি। সন্ন্যাসীদের পাঠানো ছবি এবং তিনি নিজের উদ্যোগে শ্রীরামকৃষ্ণের ছবি জোগাড় করে শুরু করলেন মূর্তির মডেল তৈরির কাজ। নির্দিষ্ট দিনে মডেল দেখতে এসে ভারী পছন্দ হল সন্ন্যাসীদের। এবার শুরু হল আসল মূর্তির কাজ। ইটালিয়ান শ্বেতপাথর খোদাই শুরু করলেন গোপেশ্বর। যে মূর্তি দেখে শুধুমাত্র শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তরা বিহ্বলিত হবেন এমন নয়, ভাবীকালের নাস্তিক মানুষও অনুভূতিবান আচার্যের ভূমিকায় যাতে উপনীত হতে পারেন সেই মূর্তি গড়ার কাজ শুরু করেছেন গোপেশ্বর। দক্ষিণেশ্বরে বিষ্ণুমন্দিরের বারান্দায় সমাধিমগ্ন অবস্থায় শ্রীরামকৃষ্ণের যে ছবিটি তোলা হয়েছিল তারই অবিকল রূপ ইটালিয়ান শ্বেতপাথরে ফুটিয়ে তুলতে সচেষ্ট হলেন গোপেশ্বর। নির্দিষ্ট দিনে সমাপ্ত হল মন্দির নির্মাণ ও মূর্তিগড়ার কাজ।
অতঃপর ১৯৩৮ সালের ১৪ জানুয়ারি, বাংলার ১৩৪৪ সালে ৩০ পৌষ মকর সংক্রান্তির দিন স্থায়ী মঠের স্থায়ী মন্দিরের দ্বারোদ্ঘাটন হল।
দ্বারোদ্ঘাটন করলেন বিজ্ঞানানন্দজী। এই শুভ অনুষ্ঠানে মন্দির নির্মাণের সময় যাঁরা অর্থ সাহায্য করেছিলেন সেই মিস হেলেন এফ রুবেল এবং মিস অ্যানা উর্স্টার সুদূর আমেরিকা থেকে এসেছিলেন। তৎকালীন সময়ে প্রায় ছয় লক্ষ টাকা তাঁরা এই নির্মাণ কাজে প্রণামী দিয়েছিলেন। স্থায়ী মঠের স্থায়ী এই মন্দিরে জড়িয়ে আছেন আর এক বিখ্যাত শিল্পী। তিনি শিল্পাচার্য নন্দলাল বসু।
শ্রীরামকৃষ্ণের সমাধিস্থ মূর্তিটি ভারতের প্রাচীন ভাস্কর্যধারা অনুসরণ করে প্রস্ফুটিত পদ্মের উপর রাখা হয়েছে। নন্দলাল বসু মূর্তির বেদি ও চন্দ্রাতপের নকশা করেছিলেন ডমরু আকৃতির, চতুস্কোণ। বেদির সম্মুখে উৎকীর্ণ হংস, তার ওপর প্রস্ফুটিত পদ্ম। ৩০ পৌষ ‘আত্মারামের কৌটা’ স্থাপন করা হল বেদির ওপর। পূজা সম্পূর্ণ করে বিজ্ঞানানন্দজী ফিরে এলেন নিজের কক্ষে। বললেন,‘স্বামীজীকে বললাম, স্বামীজী, আপনি উপর হতে দেখবেন বলেছিলেন, আজ দেখুন, আপনারই প্রতিষ্ঠিত ঠাকুর নূতন মন্দিরে বসেছেন। এবার আমার কাজ শেষ হল। স্বামীজী আমার উপর যে-কাজের ভার দিয়েছিলেন, সে-ভার আজ আমার মাথা থেকে নেমে গেল।
(সংগৃহীত)
=========================
ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বিরাজ করছেন আত্মারামের কৌটোয়বিশেষ
ঠাকুরের জন্মতিথি। আজ তাঁর অবয়বকে ঘিরে আরাধনায় ব্রতী হবেন সকলে, কিন্তু শুধুই কী অবয়ব? মূর্তি আর ফটো! না, ঠাকুর জীবদ্দশায় রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন দেখে যেতে পারেননি তিনি। বেলুড় তখন স্বপ্নাতীত কিন্তু আজও বেলুড়ে বিরাজ করছেন ঠাকুর। এ ব্রহ্মান্ডে বিরাজ করছেন তিনি। পঞ্চভূতে বিলীন হয়েও রয়ে গেলেন প্রাণের ঠাকুর।
আত্মারামের কৌটো; কত স্মৃতি কত লীলা যে জড়িয়ে আছে এই আত্মারামকে কেন্দ্র করে, তার ইয়ত্তা নেই। স্বামীজী ও তাঁর সন্ন্যাসী গুরুভাইদের প্রত্যেকের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে আত্মারামের সঙ্গে। ঠাকুরের দেহত্যাগের বছর অর্থাৎ ১৮৮৬ সালে জন্মষ্টমীর দিন ঠাকুরের সন্ন্যাসী ও গৃহী ভক্তবৃন্দ যােগােদ্যানে তাঁর অস্থি একটি কলসের মধ্যে ভর্তি করে প্রথম সমাহিত করে। ঠাকুরের প্রথম সমাধি মন্দির গড়ে ওঠে চালাঘরে সেখান থেকে আজকের পাকা মন্দির। আর তার পরের বছর থেকে এই উৎসব হয়ে আসছে। এর নাম নিত্যাবির্ভাব উতসব রূপে যােগােদ্যানে পালন করা হয়। এই নিয়ে গৃহী ও ত্যাগীদের মধ্যে বিবাদও গড়িয়েছে।
বেলুড় মঠে আজকের দিনে প্রতিবার সেই সময় থেকে আত্মারামের বিশেষ মহাস্নান ও পুজো হয়ে আসছে। বলাবাহুল্য এই অস্থির একটু একটু অংশ রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের কিছু কেন্দ্রে রাখা আছে। বেলুড়ে প্রতিদিন পুজো আরতির সময় এটি বের করা হয়। পুরীতে জগন্নাথ দেবের মহাস্নান এক পবিত্র অনুষ্ঠান। ওই দিন বেলুড় মঠে আত্মারামের কৌটোয় বিশেষ পুজো করা হয়। আত্মারামের কৌটোতেই শ্রীশ্রীঠাকুরের পবিত্র অস্থি সুরক্ষিত রয়েছে।
১৮৮৬ সালে ঠাকুরের দেহত্যাগের পর রামচন্দ্র দত্তের ইচ্ছায় স্থির হয় যে ঠাকুরের অস্থি নিয়ে যাওয়া হবে কাঁকুড়গাছি যােগােদ্যানে। যেখানে শ্রীরামকৃষ্ণ কয়েকবার পদার্পন করেছেন। কিন্ত গৃহীভক্তরা রাজি হলেও ঠাকুরের সন্ন্যাসী শিষ্যদের কাছে এই প্রস্তাবে রাজি ছিলেন না। বিশেষ করে শশী আর নিরঞ্জনের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয়, কারণ ঠাকুর গঙ্গাকে ভালােবাসতেন। এই নিয়ে রামবাবুর সঙ্গে গৃহী ভক্তদের মনমালিন্য শুরু হয়। পরে স্বামীজির সমর্থনে গােপনে আলাদা একটি কলসে অস্থিটি ভাগ করে বাগবাজারে বলরাম বসুর বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ওখান থেকে বরানগর মঠ, পরে আলমবাজার মঠ, নীলাম্বর বাবুর বাগানবাড়ি হয়ে অবশেষে বেলুড় মঠের রামকৃষ্ণ মন্দিরে পৌঁছায় আত্মারাম।
সময়টা ১৮৯৮ সাল নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়ের বাগানবাড়ি ভাড়া নিয়ে মঠ অস্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত হল। বারাণসীর সমতুল্য গঙ্গার পশ্চিম তীরে কাপ্তেনের কাঠগোলার জমিতেই মঠ প্রতিষ্ঠা করবেন স্বামীজি, এমটাই স্থির করেছিলেন। সেই মতো প্রতিষ্ঠাও করলেন। ১৮৯৮ সালের ৯ই ডিসেম্বর স্বামীজি নতুন মঠের জমিতে শ্রীরামকৃষ্ণের আত্মারামকে পুজো করে পায়েস নিবেদন করেন। আর সকাতরে প্রার্থনা করেন, ঠাকুর তুমি বহুজনহিতায় এখানে স্থির হয়ে থাকো। শোনা যায় স্বামীজি ঠাকুরকে বলেছিলেন, বল, তুমি এখানে থাকবে। তাঁর উত্তরের স্বামীজী শুনলেন, ঠাকুর বলছেন থাকব। স্বামীজি আবার বললেন, বল, জীবকল্যাণে তুমি এখানে থাকবে। ঠাকুর আবারও বলেন, থাকব। এমনই আত্মারামের মাহাত্ম্য।
সেইদিন বেলুড় মঠে দাঁড়িয়ে গুরুভাইদের উদ্দেশ্যে বিবেকানন্দ বলেছিলেন,
"কাশীপুরে ঠাকুর আমায় বলেছিলেন, 'তুই কাঁধে করে আমায় যেখানে নিয়ে যাবি, আমি সেখানেই যাব ও থাকব। তা গাছতলায় কি, আর কুটিরই কি।' সেজন্যই আমি স্বয়ং তাঁকে কাঁধে করে নতুন মঠভূমিতে নিয়ে যাচ্ছি। নিশ্চয় জানবি, বহুকাল পর্যন্ত বহুজনহিতায় ঠাকুর ওই স্থানে স্থির হয়ে থাকবেন।" সেই থেকে বেলুড় মঠের রামকৃষ্ণমন্দিরে 'আত্মারামের কৌটা'র সযত্নে সংরক্ষিত।
আত্মারামের এক চমৎকার কাহিনী বলি। আত্মারামের কৌটার ঠাকুরের ভস্মাবশেষ প্রতি স্বামীজীর অপরিসীম শ্রদ্ধা ছিল৷ তবুও একদিন আত্মারামকে প্রণাম করে বেরিয়ে আসার সময়ে তাঁর মন হল, সত্যই কি এই আত্মারামে ঠাকুরের আবির্ভাব রয়েছে? আচ্ছা, দেখি একবার প্রার্থনা করে৷ এই ভেবে তিনি মনে মনে প্রার্থনা করলেন, "ঠাকুর, তুমি যদি সত্য সত্যই এই আত্মারামের মধ্যে থাক, তবে তিনদিনের মধ্যে গোয়ালিয়রের মহারাজকে মঠে আকর্ষণ করে আনো৷ "
মহারাজা তখন কলকাতায় থাকলেও স্বামীজী জানতেন যে তাঁর তখন বেলুড় মঠে আসা কোনভাবেই সম্ভব ছিল না৷ তাই আত্মারামকে পরীক্ষা করতেই প্রার্থনা করা, তবে এ প্রার্থনা তাঁর নিজের মনেই ছিল, অন্য কারও কাছে তিনি তা প্রকাশ করেননি৷ এমনকি কিছুক্ষণ পরে তিনি নিজেও সে কথা ভুলে গিয়েছিলেন৷ পরদিন কোন কাজ উপলক্ষ্যে স্বামীজীকে কলকাতা যেতে হল৷ অপরাহ্নে মঠে ফিরে তিনি শুনলেন যে, গোয়ালিয়রের মহারাজা মঠের কাছে জি.টি. রোড দিয়ে যেতে যেতে গাড়ি থামিয়ে, স্বামীজী মঠে আছেন কিনা, সে খবর নিতে নিজের ভাইকে পাঠিয়েছেন৷ কিন্তু স্বামীজী মঠে অনুপস্থিত থাকায় দুঃখিত চিত্তে ফিরে গিয়েছেন৷ এ কথা শোনামাত্রই স্বামীজীর মনের ইচ্ছার কথা মনে পড়ল এবং তিনি ঠাকুরঘরে ছুটে গিয়ে আত্মারামকে মাথায় তুলে বার বার প্রণাম করে বলতে লাগলেন, তুমি সত্য... তুমি সত্য, তুমি সত্য।
স্বামী প্রেমানন্দ সেসময়ে ঠাকুরঘরে গিয়েছিলেন। তিনি স্বামীজীকে ঐ প্রকার করতে দেখে কিছুই বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে রইলেন৷ পরে স্বামীজীর মুখে সকল কথা শুনে বিস্ময়ে স্তম্ভিত হলেন৷ স্বামীজি সেদিন থেকে সকলকে অতি সাবধানে ওই কৌটো পুজো করার কথা বলেন। আজও সে রীতি চলে আসছে, প্রতিদিন পুজো পান আত্মারাম।
(সংগৃহীত)
========================
Comments
Post a Comment