ঠাকুর শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ দেবের ভাবনা:::--

 সমাজে শ্রীরামকৃষ্ণের ধর্মভাবনা" শীর্ষক প্রবন্ধ ::---

ঠাকুর শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ দেবের ভাবনা:::-- 


শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেব প্রকৃত মানবপ্রেমিক। তিনি মানবচরিত্রের বাহ্যিক পরিবর্তনের থেকে, চাইতেন চরিত্রের আমূল পরিবর্তন। 


বলতেন, মন ও মুখ এক করতে। তাই তিনি তথাকথিত সমাজ সংস্কারকদের চেয়ে অধিকতর প্রগতিবাদী সমাজের প্রতি মন নিবেশ করতেন।


শ্রীরামকৃষ্ণ সম্পর্কে গিরিশ ঘোষ বলেছেন, 'আপনার সব বেআইনি' অর্থাৎ প্রচলিত প্রথার উল্টো। সাধারণ ধারণায় মদ্যপান ব্যতীত তন্ত্রসাধনা হয় না। অথচ মদ্যপান ছাড়াই শ্রীরামকৃষ্ণ তন্ত্রমতের সকল সাধনায় সিদ্ধকাম। উচ্চকণ্ঠে মন্ত্র উচ্চারণ করলেই ঠাকুরের সার্থক আরাধনা হয়। শ্রীরামকৃষ্ণের পূজাপদ্ধতি ছিল বিধি বহির্ভূত। তিনি মা ভবতারিণীকে মৃন্ময়ী ভাবেন না, ভাবেন তিনি চিন্নয়ী। এই ভাবনাতেই তিনি তাঁকে জাগ্রত করেছেন --- তাঁর সঙ্গে সদালাপ করেছেন। তিনিই বলেন, পূজা মানে নিষ্ঠা ও একাগ্রতা দিয়ে ঈশ্বরকে ভালোবাসা। তাঁরই কথা 'মন তোর মন্তর'। মনই আসল জিনিস। তিনি বলতেন, 'ঈশ্বর মন দেখেন।' আবার কখনও বলেছেন, "মনেতেই শুদ্ধ, মনেতেই অশুদ্ধ' --- 'মনেতেই মুক্ত, মনেতেই বদ্ধ' দরকার শুদ্ধ মন। তিনি বলতেন, 'মন ধোপার ঘরের কাপড়, তাকে যে রঙে ছোপাবে সেই রং ধরবে।' অর্থাৎ ভালো ভাবনার আশ্রয় নিলে মনে গঠনমূলক চিন্তার উদয় হবে, আবার মনে কুপ্রবৃত্তির চিন্তা রাখলে মন সেই ভাবনাতেই আবিষ্ট হবে। মন প্রসঙ্গে তিনি ভক্তদের কাছে একটি সরস গল্প শুনিয়েছিলেন : 


'যেমনভাব তেমনি লাভ। দু'জন বন্ধু পথে যাচ্ছে। এক জায়গায় ভাগবত পাঠ হচ্ছিল। একজন বন্ধু বললে, 'এস ভাই, একটু ভাগবত শুনি।' আর একজন একটু উঁকি মেরে দেখলে। তারপর সে সেখান থেকে বেশ্যালয়ে গেল। সেখানে কিছুক্ষণ থাকার পর তার মনে বড় বিরক্তি এল। সে আপনা-আপনি বলতে লাগল, 'ধিক আমাকে। বন্ধু আমার হরিকথা শুনছে, আর আমি কোথায় পড়ে আছি।' এদিকে যে ভাগবত শুনছে, তারও ধিক্কার লেগেছে। সে ভাবছে, 'আমি কি বোকা। কি ব্যাড় ব্যাড় করে বকছে, আর আমি এখানে বসে আছি। বন্ধু আমার কেমন আমোদ-আহ্লাদ করছে।' এরা যখন মরে গেল, যে ভাগবত শুনছিল তাকে যমদূত নিয়ে গেল, যে বেশ্যালয়ে গিয়েছিল, তাকে বিষ্ণুদূত বৈকুণ্ঠে নিয়ে গেল।' 


শ্রীরামকৃষ্ণ জীবন দর্শন অনুসরণ করলে দেখা যাবে মানুষই সেখানে কেন্দ্রবিন্দু। জপের মালা অর্পণ করেছিলেন  'মা' শ্রীসারদাদেবীর পায়ে এবং দেহত্যাগের

কিছুদিন আগে তিনি যে পটে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেছিলেন, সেও ছিল এক মানুষের প্রতিকৃতি (স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণের চিত্রপট)। কাজেই শ্রীরামকৃষ্ণ দর্শনে ঘুরে ফিরে এসেছে মানুষের কথা। 


তাঁর বৃহত্তর ও ব্যাপকতর সাধনার শেষে তাঁরই কন্ঠে ধ্বনিত হয়েছে, 'মানুষ কি কম গা?' আবার কখনও বলেছেন, 'মাটির প্রতিমায় পূজা হয় আর মানুষের হবে না?' নরকে নারায়ণ স্তরে উন্নীত করেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। তাঁরই কথা, 'তুমি জান আর নাই জান তুমি রাম' 'রাম' এখানে কোনও ব্যক্তিকে নির্দেশ করছে না, 'রাম' অর্থে 'চেতনার শুদ্ধ স্তর।' অর্থাৎ সকল ব্যক্তির মধ্যে সেই উন্নত চেতনন্তর বর্তমান, আবশ্যক তাকে জাগ্রত করা অর্থাৎ চেতনার জাগরণ ঘটান। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের পয়লা জানুয়ারি কাশীপুর উদ্যানবাটির বাগান চত্বরে সমবেত গৃহীভক্তমণ্ডলীকে তিনি তাঁর শেষ আশীর্বাদ ---

'তোমাদের চৈতন্য হোক' --- বলে কৃতার্থ করেছিলেন। স্পর্শে, কথায়, দৃষ্টিতে তিনি সকল মানুষের মনে চৈতন্যের জাগরণ ঘটিয়ে তাঁদের নতুন মানুষে পরিণত করে দিয়েছিলেন। এটি ছিল শ্রীরামকৃষ্ণের নির্মাণপর্ব।


শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, 'ভক্তের জাত নেই।' অর্থাৎ যিনি ভক্ত --- সেটিই তাঁর পরিচয়। জাতি-ধর্ম-বর্ণ সবই সেখানে উহ্য। শ্রীরামকৃষ্ণ কলকাতায় ভক্তগৃহে গেলে সেখানে নানা ধর্মকথা ও কীর্তন গান সমাপ্ত হওয়ার পর ঘটত ভক্তসেবা। তাঁর সকল অনুরাগীই জানতেন, তাঁকে গৃহে নিয়ে গেলে বাধ্যতামূলক ভক্ত সেবা করাতে হবে। সেই ভক্তসেবার পঙক্তিতে ব্রাহ্মণ, মুসলমান, শূদ্র প্রভৃতি সকলেই পাশাপাশি বসে আহার করতেন। এরই মাধ্যমে সকলের অজান্তে উনিশ শতকের আটের দশকে এ যাবতের সমাজলালিত জাতপাতের পাষাণ প্রাচীর তিনি নস্যাৎ করে দিয়ে গিয়েছেন।


অতঃপর পরার্থপরতার প্রসঙ্গ। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, 'যে সত্যটিকে ধরে আছে --- সে ভগবানের কোলে শুয়ে আছে।' তাঁরই কথা, সরল হলে সহজে ঈশ্বরলাভ হয়। বলতেন, শত্রুর সঙ্গে মিষ্টভাব রাখবে। নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ যাঁদের আছে তাঁদের বলতেন, তার কিছু অংশ অন্ধ, খঞ্জ ও অনাথদের দাও --- তাতে তোমাদের মঙ্গল হবে। মথুরবাবুর সঙ্গে তিনি একবার নদীয়ার কলাইঘাটায় এবং দেওঘর গমন করেছিলেন। পথে দুর্ভিক্ষপীড়িত ছিন্ন বসনের কঙ্কালসার মানুষদের দেখে নিজে ছুটে গিয়ে তাদের মাঝে বসে শুরু করেছিলেন অনশন। অন্নের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল মথুরবাবুকে। অধিকন্তু তাদের গায়ের বস্ত্রও দিতে হয়েছিল তাঁকে। নিরন্ন ও বসনহীন মানুষ পেট ভরে আহার করলে এবং লজ্জা নিবারণের বস্ত্র পেলে তবে শ্রীরামকৃষ্ণ জল গ্রহণ করেছিলেন। মনীষী রোম্যাঁ রোলাঁ এক পত্রে বেলুড়মঠের সন্ন্যাসী স্বামী শিবানন্দের কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে, রামকৃষ্ণ মিশনের এই সেবাদর্শের সূচনা কবে থেকে? স্বামী শিবানন্দ জানিয়েছিলেন, যেদিন ঠাকুর কলাইঘাটায় (প্রথমে) ও দেওঘরের সাঁওতালপল্লিতে (দ্বিতীয়) নিরন্ন মানুষের জন্য সেবা যত্নের সুচনা করেছিলেন সেদিন থেকেই এই আদর্শের শুরু।


শ্রীরামকৃষ্ণ ধর্ম তাই মানুষের ধর্ম জীবকে শিবজ্ঞানে সেবা করতেন। শ্রীরামকৃষ্ণ আদর্শ মানুষকে সংস্কারমুক্ত হতে শেখায়, সাহসী হওয়ার প্রেরণা জোগায়, বেড়ে ওঠার উৎসাহ দেয় --- এগিয়ে চলার ছন্দ আনে --- মানুষকে মান-হুঁশ হওয়ার উদ্দীপনা জাগায়। সেই আদর্শেরই স্বামী বিবেকানন্দ কৃত বাণীমূর্তি হল ---


'জীবে প্রেম করে যেই জন

সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।'


জয় শ্রীরামকৃষ্ণের জয় --- জয় মানুষের জয় --- জয় মানবতার জয়।

(সম্পূর্ণ)


--তড়িৎ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

(তাঁর লেখা "শ্রীরামকৃষ্ণের ধর্মভাবনা" শীর্ষক প্রবন্ধ ,

ফেসবুক থেকে সংহগ্রহ )।

◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆

সমাজে শ্রীরামকৃষ্ণের ধর্মভাবনা" শীর্ষক প্রবন্ধ ।








Comments

Popular posts from this blog

স্বামীজীর মা::--

||বেলুড়মঠের প্রতিষ্ঠার কথা::---

গুরুভক্তি কেমন হওয়া উচিত ।।