স্বামী বিবেকানন্দ::---
স্বামী বিবেকানন্দ::---
সাংসারিক উন্নতির জন্য মধুরভাষী হওয়া যে কত ভাল, তাহা আমি বিলক্ষণ জানি। আমি মিষ্টভাষী হইতে যথাসাধ্য চেষ্টা করি, কিন্তু যখন অন্তরস্থ সত্যের সহিত একটা ভয়ঙ্কর আপস করিতে হয়, তখনই আমি থামিয়া যাই। আমি বিনম্র দীনতায় বিশ্বাসী নহি - সমদর্শিত্বের ভক্ত! আমি যে প্রত্যেকটি ঘোর মিথ্যার সহিত মিষ্টবাক্যে আপস করিতে পারি না, সেজন্য আমি অত্যন্ত দুঃখিত। কিন্তু আমি তাহা পারি না। সারাজীবন এইজন্য ভুগিয়াছি তবু ঐরূপ করিতে পারি না। আমি বারবার চেষ্টা করিয়াছি, কিন্তু পারি নাই। ঈশ্বর মহিমাময়, তিনি আমাকে মিথ্যাচারী হইতে দিবেন না। অবশেষে উহা ছাড়িয়া দিয়াছি, এখনে যাহা ভিতরে আছে, তাহাই ফুটিয়া উঠুক। আমি এমন কোন পথ পাই নাই, যাহা সকলকে খুশী করিবে; সুতরাং আমি স্বরূপতঃ যাহা, তাহাই আমাকে থাকিতে হইবে - আমায় নিজ অন্তরাত্মার নিকট খাঁটি থাকিতে হইবে। একমাত্র সত্যই চিরস্থায়ী। হে সত্যরূপী ঈশ্বর, তুমিই আমার একমাত্র পথ প্রদর্শক হও। আমার যথেষ্ট বয়স হইয়াছে, এখন আর মিষ্ট মধুর হওয়া চলে না। আমি যেমন আছি, যেন তেমনই থাকি। শত্রু-মিত্র কাহাকেও গ্রাহ্য না করিয়া যেন সত্যে দৃঢ়প্রতিষ্ঠ থাকি। আমার হৃদয়স্থিত সত্যের বাণী না শুনিয়া আমি কেন বাহিরের লোকদের খেয়াল অনুসারে চলিতে যাইব? যাহাকে কোন ব্যক্তি বিশেষের উপর নির্ভর করিতে হয়, সে সত্য স্বরুপ ঈশ্বরের সেবা করিতে পারে না। হৃদয় শান্ত হও, নিঃসঙ্গ হও, তাহা হইলেই অনুভব করিবে - প্রভু তোমার সঙ্গে সঙ্গে আছেন। জীবন কিছুই নহে, মৃত্যুও ভ্রমমাত্র! এসব কিছুই নয়, একমাত্র ঈশ্বরই আছেন। হৃদয়ে ভয় পাইও না, নিঃসঙ্গ হও। পথ দীর্ঘ, সময় অল্প, সন্ধ্যাও ঘনাইয়া আসিতেছে। আমাকে শীঘ্র ঘরে ফিরিতে হইবে। আদবকায়দার শিক্ষা সম্পূর্ণ করিবার সময় আমার নাই। মানুষের মনযোগানোর সময় আমার নাই। উহা করিতে গেলেই আমি ভণ্ড হইয়া পড়িব। জেলিমাছের মত জীবন যাপন করিতে পারিব না।
— স্বামী বিবকানন্দ
এক যুবক স্বামীজীকে বললেন, "মহাশয় শান্তিলাভ কিছুতেই হচ্ছে না । বলতে পারেন, কিসে শান্তি হয় ?"
স্বামীজী স্নেহপূর্ণস্বরে বলতে লাগলেন, "বাপু, আমার কথা যদি শোন, তবে তোমাকে আগে তোমার ঘরের দরজাটি খুলে রাখতে হবে । তোমার বাড়ির কাছে, পাড়ার কাছে কত অভাবগ্রস্ত লোক রয়েছে, তোমায় তাদের যথাসাধ্য সেবা করতে হবে । যে পীড়িত, তাকে ঔষধ-পথ্য যোগাড় করে দিলে এবং শরীরের দ্বারা সেবা শুশ্রুষা করলে । যে খেতে পাচ্ছে না ------- তাকে খাওয়ালে । যে অজ্ঞান, তাকে ------- তুমি যে এত লেখাপড়া শিখেছ, মুখে মুখে যতদূর হয় বুঝিয়ে দিলে । আমার পরামর্শ যদি চাও বাপু, তাহলে, এইভাবে যথাসাধ্য লোকের সেবা করতে পারলে তুমি মনের শান্তি পাবে ।"
|| গুরু ও দীক্ষা প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দ ||
গুরু কাকে বলে জানো? যে ব্যক্তির আত্মা থেকে অপর আত্মায় শক্তি সঞ্চারিত হয়, তাকে গুরু বলে।
নিষ্পাপ, বিদ্বান, কামনাহীন শ্রেষ্ঠ ব্রহ্মবিৎ হল প্রকৃত সদগুরু।
গুরু সম্পর্কে আমাদের তিনটি জিনিস দেখে নিতে হবে।
*প্রথমতঃ তিনি শাস্ত্রের মর্ম সম্পর্কে অভিজ্ঞ কিনা।
দ্বিতীয়তঃ তিনি সম্পূর্ণ নিষ্পাপ কিনা।
তৃতীয়তঃ তাঁর উদ্দেশ্য কি?
শিষ্যের প্রতি অকপট ভালোবাসা ছাড়া তাঁর মধ্যে নাম যশ বা অন্য কোনও উদ্দেশ্য আছে কিনা।
যিনি বেদ-বেদান্ত সম্পর্কে অভিজ্ঞ, যাঁরা ব্রহ্মজ্ঞ, যাঁরা অপরকে অভয়ের পারে নিয়ে যেতে সমর্থ, তাঁরাই প্রকৃত গুরু। এই রকম লোক দেখা গেলে দীক্ষা নেবে।
যিনি তোমার ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারেন, তিনিই তোমার গুরু হবার অধিকারী।
নিজেকে অথবা অপরকে দুর্বল বলিও না। যদি পার লোকের ভাল কর, জগতের অনিষ্ট করিও না। অন্তরের অন্তরে জান যে, তোমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাব—নিজদিগকে কাল্পনিক ব্যক্তির সমক্ষে অবনত করিয়া রোদন করা—কুসংস্কার মাত্র। আমাকে এমন একটি উদাহরণ দেখাও, যেখানে বাহির হইতে এই প্রার্থনাগুলির উত্তর পাওয়া গিয়াছে। যাহা কিছু উত্তর আসিয়াছে, তাহা নিজের হৃদয় হইতে। তোমরা অনেকেই জান যে—ভূত নাই, কিন্তু অন্ধকারে একটু গা ছমছম করিতে থাকে। ইহার কারণ অতি শৈশবকাল হইতেই এই-সব ভয় মাথায় ঢুকাইয়া দেওয়া হইয়াছে। সমাজের ভয়ে, লোকে কি বলিবে—এই ভয়ে, বন্ধু-বান্ধবের ঘৃণার ভয়ে, অতি প্রিয় কুসংস্কার নষ্ট হইবার ভয়ে, অপরকে এগুলি শিখাইবে না। এই প্রবৃত্তি জয় কর। ধর্মবিষয়ে শিখাইবার আর বেশি আছে কি?কেবল বিশ্বের একত্ব ও নিজের উপর বিশ্বাস।
— স্বামী বিবেকানন্দ ( জ্ঞানযোগ )
সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ
স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন,
''ধর্ম হল সেটাই, যা পশুকে মানুষে এবং মানুষকে দেবতায় পরিণত করে।''
এর অর্থ - ধর্ম হল একটি বিকাশের প্রক্রিয়া। পাশবিক মানুষের আনন্দ শুধু শরীরগত। শরীরের সুখ বা ইন্দ্রিয়চরিতার্থতা ছাড়া সে আর কিছুই বোঝেনা।
আর একটু উন্নত হলে মানুষ মানসিক আনন্দলাভের অধিকারী হয়, তখন সে সাহিত্য রস, শিল্পের রস অনুভব করতে পারে। এটাকে মানবীয় স্তর বলা যায়।
আরও উন্নত অবস্থায় মানুষ ঈশ্বরীয় আনন্দে বিভোর হয়, ধ্যানাবস্থায় শান্তির অপূর্ব পরিবেশ অনুভব করতে পারে; যাকে বলা যায় দৈবী স্তর।
এভাবে উন্নত হতে হতে মানুষ যখন দেহ, মন ইন্দ্রিয়ের গণ্ডি অতিক্রম করে তখনই সে লাভ করে শাশ্বত জ্ঞান বা সনাতন সত্য। সে অনুভব করে সে ক্ষুদ্র নয় সে দেহ নয়, মন নয় এমনকি চিন্তা চেতনাও নয়, সে আত্মা। সে এক অনন্ত, অখণ্ড অস্তিত্ব।
মানুষ তখন তার ক্ষুদ্রতার খোলস পরিত্যাগ করে অনন্ত 'আমিত্বে' লীন হয়ে যায়।
'নির্গচ্ছতি জগজ্জালাৎ পিঞ্জরাদিব কেশরী' -- সিংহ যেমন পিঞ্জর ভেঙ্গে ফেলে বেরিয়ে যায় ঠিক তেমনি সে এই জগৎ-জাল ভেদ করে মুক্ত হয়ে যায়। ধর্মের চরম লক্ষ্য হল মুক্তি।
ধর্ম হল এই রূপান্তরের প্রক্রিয়া, যা পশুকে মানুষে, মানুষকে দেবতায় এবং দেবতাকে ঈশ্বরে বিকশিত করে।
(সংগ্রহীত)
==========+===========
Comments
Post a Comment