|| স্বামীজির পাগড়ি
⚜️স্বামীজির পাগড়িকে অমূল্য রত্নের মতো আগলে রেখেছে রামকৃষ্ণপুরের ঘোষপরিবার।*
গঙ্গার পশ্চিমপাড়ে আজও অমর এক দিব্যপুরুষের পাগড়ির উপাখ্যান। অমূল্য রত্নের মতো সেই পাগড়ি আজও আগলে রেখেছে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের শিষ্য নবগোপাল ঘোষের পরিবার। আর রাখবেন না-ই বা কেন? কারণ সেই দিব্যপুরুষ যে আর কেউ নন, স্বয়ং স্বামীজি নিজে। ক্ষেত্রীর মহারাজা অজিত সিংয়ের দেওয়া সেই পাগড়ি পরেই স্বামীজি গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বক্তৃতা দিয়েছিলেন শিকাগো ধর্ম মহাসভায়। নবগোপালবাবুর স্ত্রী নিস্তারিণী দেবীর অপূর্ব রন্ধনে প্রসন্ন হয়েই ‘সর্বত্যাগী’ বিবেকানন্দ রেখে গিয়েছিলেন সেটি।
এই পাগড়ির সেই অমর উপাখ্যান কেমন? নবগোপাল ঘোষের প্রপৌত্র অধ্যাপক সুব্রত ঘোষের বক্তব্য, রামকৃষ্ণদেবের সাক্ষাৎ মন্ত্রশিষ্য ছিলেন নবগোপালবাবু। স্বামী বিবেকানন্দ আর তিনি তাই গুরুভাই ছিলেন। সারাদিনে একবার গুরুদেবের নাম নিতে হবে, এই ভাবনা থেকেই তিনি বাড়ি করেন রামকৃষ্ণপুরে। যাতে কাউকে বাড়ির ঠিকানা বলতে গেলে আপনা থেকেই মুখে চলে আসে গুরুদেবের নাম। সেইমতো ১৮৮০ সালে ২২ কাঠা জমি কিনে বাড়ি করেছিলেন রামকৃষ্ণদেবের এই মন্ত্রশিষ্য। সেই যুগেই তিনি ২১১ টাকা ৭৫ পয়সার মোটা মাস মাইনে পেতেন একটি সংস্থার মুখ্য হিসেবরক্ষক হিসেবে। তাঁর সেই বাড়িতেই শ্রীরামকৃষ্ণের মন্দির স্থাপন করতে ১৮৯৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি মাঘী পূর্ণিমার দিনে এসেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ।
তার ঠিক কিছুদিন আগেই তিনি শিকাগো ধর্মসভা সেরে দেশে ফিরেছেন। নবগোপালবাবুর ডাকে সাড়া দিয়ে আলমবাজার মঠ থেকে সপার্ষদ তিনটি নৌকা নিয়ে স্বামীজি এলেন রামকৃষ্ণপুর ঘাটে। ঘাট থেকে হেঁটে যাওয়ার সময় তাঁর মাথায় ছিল ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের একটি পট, যা প্রতিষ্ঠা হবে বাড়ির ঠাকুরঘরে। আমেরিকা থেকে বাড়ি ফেরার পথে বার্লিন ঘুরে আসার সময় ঠাকুরের পোর্সিলিনের ওই পট তৈরি করেছিলেন তিনি নিজেই। কিন্তু, সমস্যা দেখা দিল পুজোয় বসে। কারণ রামকৃষ্ণদেকে পুজো করা হবে কী মন্ত্রে, তা তখনও কারও জানা ছিল না। প্রশ্ন করেছিলেন স্বামী প্রকাশানন্দ। উত্তরে বিবেকানন্দ নিজে কিছু না বলে ধ্যানমগ্ন হলেন। এইভাবে কিছুক্ষণ থাকার পর তাঁর সেই গম্ভীর কণ্ঠে উচ্চারিত হল, ‘ওম স্থাপকায়চ ধর্ম্মস্য, সর্বধর্ম্ম স্বরূপিণে, অবতার ধরিষ্ঠায়, রামকৃষ্ণায়তে নম।’ অর্থাত্ নবগোপালবাবুর বাড়িই সেই বাড়ি, যেখানে প্রথম ঠাকুরের প্রণাম মন্ত্র রচিত হয়। আজ তা সারা বিশ্বের রামকৃষ্ণ ভক্তদের মুখে উচ্চারিত হয়। একইসঙ্গে সেই পুজোর সংকল্প হয় মা সারদার নামে। আজও সমস্ত পুজোয় এই নিয়ম মেনেই মায়ের নামে সংকল্প করা হয়। অর্থাৎ একই ঘরে তৈরি হল দু’টি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। পুজো তো হল, কিন্তু আহারাদি? নবগোপালবাবুর স্ত্রী নিস্তারিনী দেবীর হাতে রান্না করা খাবার খেলেন সপার্ষদ বিবেকানন্দ। গুরুভাইয়ের স্ত্রীর রান্না করা খাবার খেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন ভোজন রসিক স্বামীজি। কিন্তু তিনি তো সর্বত্যাগী, সেই রান্নার জন্য কী দেবেন উপহার? ক্ষেত্রীর মহারাজের দেওয়া সেই ঐতিহাসিক পাগড়ি মাথা থেকে খুলে নিজের হাতে তুলে দিলেন নিস্তারিনীদেবীর হাতে। আজও সেই বিখ্যাত পাগড়ি সযত্নে রাখা আছে ঘোষ পরিবারে। মাঘী পূর্ণিমার দিন ভক্তদের পাগড়ি দর্শনের সুযোগ হয় আজও।
#জয় #স্বামিজী
Comments
Post a Comment