27>||বেলঘরিয়া রামকৃষ্ণ মিশন স্টুডেন্ট হোম ||
27>||বেলঘরিয়া রামকৃষ্ণ মিশন স্টুডেন্ট হোম ||
দেখতে দেখতে মায়ের মৃত্যু বার্ষিকীর এক বছর হয়ে যাবে ১১ই এপ্রিল।
মনে পড়ে যাচ্ছে এই রকম যখন বাবা চলে গেছিলেন আমাদের দু বোনেরই বয়স অনেকটা কম ২০০২ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারী, সরস্বতী পুজো।
বাবা চলে যাবার পরে আমি একা যাই সত্যকৃষ্ণ মহারাজের (স্বামী আত্মস্থানন্দজী মহারাজ ) কাছে। তখন একাই যেতাম এই কারণে দিদির বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সব জায়গায় ও ততটা যেতে পারতো না যতটা আমি মহারাজের সঙ্গে ঘুরতে পারতাম।
মহারাজের সঙ্গে মহারাজের অনেক ভক্ত থাকলেও তারা বয়সে অনেকটা বড় হওয়ায় আমার নাম গুলো অত সবার মনে নেই। তবে দুজন মহারাজের শিষ্য আমার মতন। তারা দুই ভাই বোন তাদের সঙ্গে আমার আজও যোগাযোগ আছে কারণ মহারাজ নিজে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তাদের সঙ্গে। তারা হলেন দেবরাজ মিত্র এবং ওর দিদি নীলাঞ্জনা মিত্র কুন্ডু। ওরা দুই ভাই বোন আমার মতন মহারাজের খুব স্নেহের পাত্র ছিল।
বাবা মারা যাবার পর মহারাজের কাছে যেতেই মহারাজ সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিলেন যে ওনার টাইফুন পিতৃ হারা হয়েছে জেনে। উনি ওনার ঘরে প্রসাদ খাইয়ে বললেন " তোকে আমার সব থেকে প্রিয় জায়গায় পাঠাবো। দেখবি কত তোর ভালো লাগবে। আমি বলে রাখছি চলে যাবি কিন্তু। "
চলে গেলাম মহারাজের কথায়। মহারাজের সব থেকে প্রিয় সেন্টারটি হচ্ছে বেলঘরিয়া রামকৃষ্ণ মিশন স্টুডেন্ট হোম। আমার প্রথম যাওয়া।
তখন ওখানকার সেক্রেটারি স্বামী অন্নপূর্ণানন্দজী মহারাজ (সুব্রত মহারাজ )
। পরে উনি কাশী সেবাশ্রমের সেক্রেটারি হয়েছিলেন যখন আমি কাশী গেছিলাম। খুব সুন্দর গানও গাইতেন। বহুবার শুনেছি ওনার গলায় মায়ের গান " কেহ নাহি যার আছো তুমি তার। তব পানে চেয়ে থাকি। আমারে দিও না ফাঁকি। " রাত জেগে দেখেছি বেলঘরিয়া মঠের কালী পুজো।
বেলঘরিয়ার মহারাজরা সত্যকৃষ্ণ মহারাজকে দাদা সম্বোধন করতেন কারণ বেলঘরিয়া স্টুডেন্ট হোমের ছাত্র ছিলেন সত্যকৃষ্ণ মহারাজ এবং শুধু তাই নয় বহু ছেলে এই স্টুডেন্ট হোম থেকে বেলুড় মঠের সাধু হয়েছে।
সুব্রত মহারাজ সারাদিন ধরে অনেক গল্প করতে লাগলেন। বললেন " বড় লোকরা আলসেস্যিয়ান কুকুর পোষে দ্যাখ আমাদের এখানে আমরা কত রোডেশিয়ান কুকুর অর্থ্যাৎ রাস্তার কুকুর সব রয়েছে। বড় এলাকা তো।
আলাপ হলো সুপ্রকাশ মহারাজ, সরোজ মহারাজ। বিরাট ক্ষেত , মাঠ। বেলায় ক্ষেতে ট্র্যাক্টর চালাচ্ছেন নিজে স্বামী একব্রতানন্দজী (বাদল মহারাজ ) যিনি বর্তমানে বেলঘরিয়া মঠের সেক্রেটারি। খুব ভালো গাড়ি চালাতেও পারেন আবার গানও গাইতে পারেন।
পরিচয় হলো স্বামী নিত্যসত্যানন্দজী মহারাজের (বিশ্বরূপ মহারাজ ) সঙ্গে। গলায় সব সময় একটা ক্যামেরা ঝুলছে । খুব মিশুকে। প্রথম দেখাতেই " ওরে মন খারাপ করবি না। বাবা কি সারা জীবন থাকে? আমরা কাকারা তো আছি। "
বেলঘরিয়ায় যেটা সব থেকে ভালো লেগেছিলো বিরাট মাঠ বিকেলে ছাত্রদের সঙ্গে সাধুরাও খেলছে।
গদাধর প্রকল্পের বাচ্চাদের খুব যত্ন সহকারে পড়িয়ে দিতে আসছে বেলঘরিয়া মিশনেরই প্রাক্তন ছাত্ররা।
দুপুরের প্রসাদ খেলাম কাঁসার সব বাসনে।
বেলঘরিয়ার কথা মনে হলেই খুব মিস করি বিশ্বরূপ মহারাজকে। বলতেন " আমি স্বামী অচ্যুতানন্দজী মহারাজের ভাইপো। " বয়স্ক সাধু তাই আমি বলি " ওনাকে চিনি কিন্তু কাছে যেতে ভয় করে। " বললেন " ঐ রাগী রাগী আচরণটা ওনার acting। তা না হলে সবাই বিরক্ত করবে, প্রণাম করবে। একদিন ভয় না পেয়ে ভাব করে নে। "
ভাব করেওছিলাম সে ঘটনা পরে লিখবো।
বিশ্বরূপ মহারাজ পরে চলে যান রামকৃষ্ণ মিশন দার্জিলিং সেন্টারে। অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন ঐ সেন্টারটিকে দাঁড় করানোর জন্য।
বলতেন " এখানকার বাচ্চা গুলো আমাকে খুব ভালোবাসে। একটি ছোট্ট মেয়ে তার মুখে বিরাট জরুল ছিল। ভবিষ্যতে মেয়েটির বিয়ে বা অন্য ব্যাপারে যাতে অসুবিধে না হয় তাই শিশু বয়েসেই যাতে বাচ্চাটির অপারেশন হয়ে যায় তাই অক্লান্ত পরিশ্রম করে তার চিকিৎসার টাকা তুলেছেন।
পুজোর সময় বাচ্চা গুলোকে নিয়ে আসতেন কলকাতায় দূর্গা পুজো দেখাতে।
সব সময় আমি যাতে আনন্দে থাকি সেই উৎসাহ দিতেন। গানও গাইতেন ফোনের মধ্যেই। তার একটি প্রিয় গান ছিল -
" কৃষ্ণ যদি যায় মথুরায় আঁধার হবে ব্রজধাম।
ব্রজের ধুলা লতা পাতায় লেখা আছে কৃষ্ণনাম।।
চড়বে না আর গোঠে ধেনু, বাজবে না আর মোহন বেনু।
দেখবে না কেউ নীল যমুনায় ঢেউ দিয়ে যায় ঘনশ্যাম।।
ওরা তোরা দিস নে যেতে রথের তলায় দে বুক পেতে।
চলে গেলে আসবে না আর ঘরে ফিরে গুনধাম।। "
নিবেদিতার শেষ জীবন কাটে দার্জিলিং এর এই বাড়িটিতে যেখানে এখন দার্জিলিং রামকৃষ্ণ মঠ হয়েছে। তাই বিশ্বরূপ মহারাজ প্রতিদিন whtsup এ পাঠাতেন নিবেদিতার বাণী।
একদিন হঠাৎ করে সেই whtsup মেসেজ আসা থেমে গেল। মহারাজ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন আচমকাই হৃদ রোগে আক্রান্ত হয়ে। যখন মহারাজের শরীর নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দাহ করার পথে সারা দার্জিলিং সেদিন ভেঙে পড়েছিল এবং যোগদান করেছিল মহারাজের অন্তিম সেই পদ যাত্রায়।
দার্জিলিং এ নিবেদিতার সঙ্গে আজও মিশে আছে আমার শ্রদ্ধেয় বিশ্বরূপ মহারাজের শরীর।
এরপরেও অনেক বার বেলঘরিয়া রামকৃষ্ণ মিশনে গেছি এবং বিশেষ করে গেছি যখন সত্যকৃষ্ণ মহারাজ ওখানে গেছেন। আজও আমি অনুভব করি সত্যকৃষ্ণ মহারাজ আছেন সুশ্ম শরীরে তার প্রিয় সেন্টার বেলঘরিয়া রামকৃষ্ণ মিশনে।
প্রণাম জানাই সত্যকৃষ্ণ মহারাজকে এবং বিশ্বরূপ মহারাজকে।
মধুমিতা ঘোষ (টাইফুন )
৯৮৩০৬৮৯৯৩৬
(সংগ্রহীত)
আমার নিজের ছোটবেলার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বেলঘরিয়া রামকৃষ্ণ মিশন স্টুডেন্ড হোমের সঙ্গে।
বাবার হাত ধরে যেতাম মিশনে ,
তারপরে নিজে একলাই যেতাম রোজ প্রসাদ খাবার লোভে।
পৃথ্বীস মহারাজ, শিবেন মহারাজ, ধ্যানাত্ম নন্দজী মহারাজ, আরও অনেক মহারাজ যারা আমাকে ভীষণ ভালো বসতেন।
শিবেন মহারাজ রোজ আমার জন্য নারকেল নাড়ু রেখে দিতেন। কালীপূজার সময়ে সারা রাত্রি জেগে পূজা হোম যজ্ঞ দেখতাম, ভোর বেলা ফল প্রসাদ ও পরে ভোগ প্রসাদ খেয়ে বাড়ি ফিরতাম।
সকালে ওই খিচুড়ি ভোগ প্রসাদ খাবার জন্য অনেক মানুষের লাইন পড়তো।
মহারাজেরা সমলকে বসিয়ে অনেক যত্নসহকারে প্রসাদ বিতরণ করতেন।
সেই প্রসাদ বিতরণের ধরা এখনও হয়, তবে আমি নিজে আর যেতে পারিনা।
আজও কিন্তু বার বার মনেপোরে বেলঘরিয়া রামকৃষ্ণ মিশন স্টুডেন্টহোমের স্মৃতি।
ছোটবেলা গুলি কত সুন্দর ছিল,
বড় হয়ে সব কেমন যেন ওলট পালট হয়ে গেল। কিন্তু ছোটবেলার সেই স্মৃতি আজও মনকে নাড়িয়ে দেয়, অনেক ভাবায়।
<---আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->
27/03/2026 সন্ধ্যা 08:50:10
======================
Comments
Post a Comment